🗺️ আজকের অভিযান
দাদা আজ মাহদীকে ডেকে পাঠালেন।
তাঁর হাতে একটা ছোট কাঠের বাক্স — যেটা মাহদী আগে কখনো দেখেনি।
"বসো।"
দাদা বাক্সটা খুললেন। ভেতরে ভেলভেটের উপর শোয়ানো একটা ঝর্নাকলম — পুরনো, কালচে সবুজ, নিবটা সোনালি।
"এটা আমার ছাত্রজীবনের কলম," দাদা বললেন। "এটা দিয়ে আমার প্রথম গবেষণাপত্র লিখেছিলাম। ঊনসত্তর সালে।"
মাহদী কলমটার দিকে তাকিয়ে রইল।
"দাদা, এত পুরনো!"
"পুরনো, কিন্তু এখনো চলে।" দাদা কলমটা তুলে মাহদীর হাতে দিলেন। "এখন থেকে এটা তোমার।"
"আমার?!"
"তোমার। কিন্তু একটা শর্তে।"
"কী শর্ত?"
দাদা চেয়ারে হেলান দিলেন। চোখ দুটো চকচক করছে, কিন্তু গলাটা গম্ভীর।
"এই কলম দিয়ে তুমি কোনোদিন এমন কিছু লিখবে না যা মিথ্যা। একটা লাইনও না।"
ঘরটা চুপ হয়ে গেল।
"মনে রেখো দাদুভাই," দাদা বললেন, "মানুষ ভাবে যুদ্ধ হয় অস্ত্র দিয়ে। কিন্তু আমি চল্লিশ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটিয়ে দেখেছি — পৃথিবী বদলায় যা লেখা হয় তা দিয়ে। ভুল কিছু লিখলে সেটা একশো বছর ধরে মানুষকে ভুল পথে নেবে।"
মাহদী কলমটা দুই হাতে ধরে রইল। ভারী লাগছিল — ওজনে নয়।
সেই রাতে দ্বীপের ঘাটে হুদহুদ অপেক্ষা করছিল। কিন্তু আজ সে ঝুঁটি ফোলাল না, ঠাট্টাও করল না।
"আজকের আয়াত পড়ব," সে বলল। "তারপর তোমাকে কিছু বলব।"
إِنَّ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ وَعَمِلُوا۟ ٱلصَّـٰلِحَـٰتِ أُو۟لَـٰٓئِكَ هُمْ خَيْرُ ٱلْبَرِيَّةِ (ইন্নাল্লাযীনা আমানূ ওয়া আমিলুস সালিহাতি উলাইকা হুম খইরুল বারিয়্যাহ — নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তারাই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ)
"خَيْرُ ٱلْبَرِيَّةِ," হুদহুদ বলল। "সৃষ্টির সেরা। কালকের আয়াতে ছিল শাররুল বারিয়্যাহ — সৃষ্টির অধম। আজ ঠিক উল্টোটা।"
"সৃষ্টির সেরা মানে... সবার চেয়ে?"
"কিছু আলেম বলেছেন — এমনকি ফেরেশতাদের চেয়েও।"
মাহদী হাঁ করে তাকিয়ে রইল। "ফেরেশতাদের চেয়ে?!"
"ভেবে দেখো কেন," হুদহুদ বলল। "ফেরেশতাদের পাপ করার ক্ষমতাই নেই। তাঁদের ভালো থাকা সহজ। কিন্তু তোমার? তোমার ভেতরে দুইটা গলা। তুমি পারতে খারাপটা বেছে নিতে — তবু নাওনি।"
"তাই আল্লাহ সেই মানুষকে বিশেষ মর্যাদা দিলেন যে পারত, তবু করেনি।"
হুদহুদ পরের আয়াতটা পড়ল — লম্বা আয়াত, থেমে থেমে।
جَزَآؤُهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّـٰتُ عَدْنٍ تَجْرِى مِن تَحْتِهَا ٱلْأَنْهَـٰرُ خَـٰلِدِينَ فِيهَآ أَبَدًا (জাযাউহুম ইনদা রব্বিহিম জান্নাতু আদনিন তাজরী মিন তাহতিহাল আনহারু খালিদীনা ফীহা আবাদা — তাদের প্রতিদান তাদের রবের কাছে: স্থায়ী জান্নাত, যার নিচে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে)
"আর এবার সবচেয়ে সুন্দর অংশটা," হুদহুদ বলল।
رَّضِىَ ٱللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا۟ عَنْهُ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম ওয়া রাদূ আনহু — আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট, আর তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট)
"রাদিয়াল্লাহু আনহু!" মাহদী চেঁচিয়ে উঠল। "এটা তো আমরা সাহাবিদের নামের পরে বলি!"
"হ্যাঁ।" হুদহুদ বলল। "আর খেয়াল করো — দুইদিক থেকে। আল্লাহ তাদের প্রতি খুশি, তারাও আল্লাহর প্রতি খুশি।"
"জান্নাতের সবচেয়ে বড় পুরস্কার বাগান নয়, মাহদী। নদীও নয়। দুই পক্ষের সন্তুষ্টি।"
তারপর হুদহুদ চুপ করে গেল।
অনেকক্ষণ।
"মাহদী বিন মামুন," সে শেষে বলল, আর গলাটা একদম আলাদা শোনাল। "উঠে দাঁড়াও।"
মাহদী উঠে দাঁড়াল। বুকটা ধুকপুক করছে।
"বারো সপ্তাহ আগে তুমি এই ঘাটে এসেছিলে। رَبِّ মানে জানতে না।"
"আজ তুমি শত্রুর নাম জানো। তার অস্ত্র জানো। আর তোমার নিজের অস্ত্রও জানো।"
হুদহুদ ডানা মেলল — পুরোটা, প্রথমবারের মতো।
"আজ থেকে তুমি সেনাপতি।"
মাহদীর গলা শুকিয়ে গেল। "আমি? কিন্তু আমার তো কোনো সৈন্য নেই!"
"আছে।"
"কোথায়?"
"তোমার সেনাবাহিনীর নাম জ্ঞান," হুদহুদ বলল। "আর তোমার অস্ত্র তিনটে।"
সে গুনতে লাগল।
"এক — মুখস্থ কুরআন। অর্থসহ, শুধু আওয়াজ নয়। যা তোমার বুকের ভেতরে থাকবে, তা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।"
"দুই — ভালো চরিত্র। মিযানে সবচেয়ে ভারী জিনিস, মনে আছে?"
"তিন — কঠিন পড়াশোনা। অঙ্ক, বিজ্ঞান, ইতিহাস — সব। কারণ যে জানে, তাকে ধোঁকা দেওয়া কঠিন।"
মাহদী দাদার কলমটার কথা ভাবল, বালিশের নিচে রাখা।
"আর যুদ্ধটা কবে হবে?"
"যুদ্ধটা আজ থেকেই শুরু, সেনাপতি। প্রতিদিন। প্রতিটা পড়ার টেবিলে, প্রতিটা সত্যি কথায়, প্রতিটা রাতে যখন তুমি ঘুমের বদলে বইটা খোলো।"
তারপর মাহদী একটা প্রশ্ন করল, যেটা অনেকদিন ধরে তার মাথায় ছিল।
"হুদহুদ... আমার নাম মাহদী।"
"জানি।"
"আমি শুনেছি কিয়ামতের আগে একজন মাহদী আসবেন। আমি কি..."
হুদহুদ সাথে সাথে ডানা তুলে থামিয়ে দিল।
"না।"
শব্দটা এত জোরে এল যে মাহদী চমকে উঠল।
"শোনো মাহদী, খুব ভালো করে শোনো। এই প্রশ্নটা তুমি করেছ, ভালো করেছ — কিন্তু উত্তরটা এক কথায়: না।"
"ইতিহাসে বহু মানুষ এই দাবি করেছে। প্রত্যেকবার সর্বনাশ হয়েছে। মানুষ মরেছে, উম্মত ভাগ হয়েছে, আর দাবিদাররা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।"
"তাহলে আমার নামটা?"
হুদহুদের গলা নরম হয়ে এল।
"তোমার নামটা একটা দোয়া, দাবি নয়। তোমার আব্বু-আম্মু নাম রেখেছেন এই আশায় যে আল্লাহ তোমাকে সঠিক পথ দেখান। নামটা তোমাকে কিছু বানায় না — নামটা তোমাকে একটা কাজ ধরিয়ে দেয়।"
"কী কাজ?"
"নামের যোগ্য হয়ে ওঠো। ন্যায়পরায়ণ হও, গভীরভাবে শেখো, সাহসী হও, মানুষের কাজে লাগো।"
হুদহুদ ঝুঁটি ফোলাল।
"আর একটা কথা মনে রেখো, সেনাপতি। যে সত্যিই বড়, সে কখনো নিজেকে বড় বলে না। যেদিন কেউ এসে বলবে আমিই সেই — সেদিন বুঝবে সে নয়।"
মাহদী মাথা নাড়ল।
"তাহলে আমি কে?"
হুদহুদ হাসল — অনেকদিন পর।
"তুমি সাতক্ষীরার একটা নয় বছরের ছেলে, যে গত বারো সপ্তাহে رَبِّ থেকে خَيْرُ ٱلْبَرِيَّةِ পর্যন্ত হেঁটে এসেছে।"
"এটাই যথেষ্ট।" ⚔️