🗺️ আজকের অভিযান
শিলাবৃষ্টির তিন দিন পর।
মাহদী ভেবেছিল নানা ভেঙে পড়বেন। কিন্তু সকালে গিয়ে দেখল নানা আড়তে বসে নতুন হিসাব লিখছেন।
"নানা, সরিষা তো গেল। এখন?"
"এখন ডাল," নানা বললেন, চোখ না তুলেই। "সরিষার জমিতে এখন ডাল বসাব। দেরি হয়ে গেছে, তবু হবে।"
দুপুরে অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটল।
পাশের গ্রামের তিনজন চাষি এলেন — যাঁদের ক্ষেতও নষ্ট হয়েছে। তাঁরা এসেছেন নানার কাছে বীজ ধার চাইতে।
নানা গুদাম খুলে বীজ বের করলেন। টাকা নিলেন না।
একজন বললেন, "আপনারও তো ক্ষতি হয়েছে সরদার সাহেব।"
নানা বস্তার মুখ বাঁধতে বাঁধতে বললেন, "হয়েছে। কিন্তু আমার গুদামে বীজ আছে, আপনাদের নেই। তার মানে আমার রিজিক এখনো বন্ধ হয়নি।"
ফেরার পথে মাহদী জিজ্ঞেস করল, "নানা, আপনার ভয় লাগে না? যদি সব শেষ হয়ে যায়?"
নানা থামলেন।
"একটা কথা বলি, দাদুভাই। যে ভাবে সব তার হাতে, সে ভাঙা ক্ষেতের সামনে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে ফেলে।"
"আর যে জানে রিজিক অন্য কারো হাতে? সে মাথা তুলে হাঁটে। কারণ ওই হাতটা তো এখনো আছে।"
সেই রাতে হুদহুদ বলল, "আজকের আয়াতটা একটা প্রশ্ন — আর প্রশ্নটা এই সূরার সবচেয়ে কড়া।"
أَمَّنْ هَـٰذَا ٱلَّذِى يَرْزُقُكُمْ إِنْ أَمْسَكَ رِزْقَهُۥ (আম্মান হাযাল্লাযী ইয়ারযুকুকুম ইন আমসাকা রিযকাহ — এমন কে আছে যে তোমাদের রিজিক দেবে, যদি তিনি তাঁর রিজিক বন্ধ করে দেন?)
"رِزْق — মনে আছে?"
"রিজিক! নানা রোজ বলেন।"
"আর أَمْسَكَ — ধরে রাখল, আটকে দিল। মনে আছে গত সপ্তাহে يُمْسِكُهُنَّ? পাখিদের ধরে রাখেন?"
মাহদী চমকে উঠল। "একই শব্দ!"
"একই।" হুদহুদ ঝুঁটি নাড়ল। "যে হাত পাখিকে ধরে রাখে, সেই হাতই রিজিক ধরে রাখতে পারে।"
মাহদী চুপ করে রইল।
"হুদহুদ, তিন দিন আগে নানার সরিষা শেষ হয়ে গেছে। আজ উনি আবার বীজ কিনছেন।"
"আর অন্যদের?"
"অন্যদেরও দিয়েছেন। টাকা নেননি।"
হুদহুদ কিছুক্ষণ কিছু বলল না।
"তোমার নানা আজ কী বলেছেন?"
"বলেছেন — আমার গুদামে বীজ আছে, ওদের নেই। তার মানে আমার রিজিক এখনো বন্ধ হয়নি।"
"সেনাপতি," হুদহুদ ডানা ভাঁজ করল, "এই এক লাইনে তোমার নানা আয়াতটার তাফসীর করে ফেলেছেন।"
তারপর সে পরের আয়াতটা পড়ল — আর হঠাৎ একটা অদ্ভুত দৃশ্য ভেসে উঠল সামনে।
একটা মানুষ হাঁটছে — কিন্তু মুখ থুবড়ে, কোমর ভাঁজ করে, নাক প্রায় মাটি ছুঁয়ে। সে হোঁচট খাচ্ছে, ধাক্কা খাচ্ছে, তবু ওভাবেই এগোচ্ছে।
আর তার পাশ দিয়ে আরেকজন হেঁটে যাচ্ছে — সোজা হয়ে, মাথা তুলে।
أَفَمَن يَمْشِى مُكِبًّا عَلَىٰ وَجْهِهِۦٓ أَهْدَىٰٓ أَمَّن يَمْشِى سَوِيًّا عَلَىٰ صِرَٰطٍ مُّسْتَقِيمٍ (আফামাই ইয়ামশী মুকিব্বান আলা ওয়াজহিহি আহদা আম্মাই ইয়ামশী সাওয়িয়্যান আলা সিরাতিম মুসতাকীম — যে মুখ থুবড়ে হাঁটে সে কি বেশি পথপ্রাপ্ত, না যে সোজা হয়ে সরল পথে চলে?)
"مُكِبًّا মানে মুখ থুবড়ে, ঝুঁকে," হুদহুদ বলল। "আর سَوِيًّا মানে সোজা হয়ে।"
"হুদহুদ, শেষের শব্দ দুইটা তো আমি চিনি!"
"বলো।"
"صِرَٰطٍ مُّسْتَقِيمٍ! সূরা ফাতিহা! আমি দিনে ১৭ বার চাই!"
হুদহুদ ডানা ঝাপটাল। "আর আজ তুমি প্রথমবার দেখলে সেই পথে হাঁটা মানুষটা কেমন দেখতে।"
"কেমন?"
"সোজা। মাথা তুলে।"
তারপর সে মাহদীর দিকে ফিরল।
"আর যে মুখ থুবড়ে হাঁটে, সে কেন ওভাবে হাঁটে বলো তো?"
মাহদী মাথা নাড়ল।
"কারণ সে শুধু পায়ের নিচেরটুকু দেখে। এক পা সামনে কী আছে, সেটাও জানে না।" হুদহুদ বলল। "যে ভাবে সব তার নিজের হাতে, সে ওভাবেই হাঁটে — প্রতিটা পদক্ষেপ নিয়ে ভয়ে।"
"আর যে জানে রিজিক অন্য কারো হাতে?"
মাহদীর নানার কথাটা মনে পড়ল।
"সে মাথা তুলে হাঁটে," সে বলল। 🚶