🗺️ আজকের অভিযান
দাদা আজ একটা অদ্ভুত পরীক্ষা করালেন।
"চোখ বাঁধো," তিনি একটা গামছা বাড়িয়ে দিলেন। "দশ মিনিট। আমি সাথে আছি, ভয় নেই।"
মাহদী চোখ বাঁধল।
প্রথম এক মিনিটেই তার মনে হলো ঘরটা বদলে গেছে। চেয়ারটা কোথায়? দরজা কোনদিকে?
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপারটা হলো — সে অনেক বেশি শুনতে পাচ্ছিল।
ফ্যানের ঘরঘর। উঠানে কাকের ডাক। রান্নাঘরে দাদির চুড়ির শব্দ। দূরে একটা রিকশার হর্ন। দাদার শ্বাস-প্রশ্বাস।
দশ মিনিট পর গামছা খুলে সে বলল, "দাদা, চোখ বন্ধ করলে কান বড় হয়ে যায়!"
দাদা হাসলেন। "এবার উল্টোটা। কানে আঙুল দাও, শক্ত করে। দশ মিনিট।"
মাহদী কানে আঙুল দিল।
এবার সে সব দেখতে পাচ্ছে — কিন্তু একটা অদ্ভুত একাকিত্ব ঘিরে ধরল। দাদা ঠোঁট নাড়ছেন, সে কিছু বুঝছে না। তাসমিয়া হেসে কী যেন বলল, সে জানে না কী।
দশ মিনিট পর সে আঙুল সরিয়ে বলল, "এইটা বেশি খারাপ লেগেছে, দাদা।"
"কেন?"
"চোখ বাঁধা থাকলে আমি একা ছিলাম না — সবার আওয়াজ শুনছিলাম। কিন্তু কান বন্ধ থাকলে সবাই ছিল, তবু আমি একা।"
দাদা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
"দাদুভাই, আজ তুমি নিজে থেকে এমন একটা জিনিস আবিষ্কার করলে যেটা কুরআনে লেখা আছে।"
"কী দাদা?"
"কুরআনে যেখানেই কান আর চোখের কথা একসাথে এসেছে, কান সবসময় আগে। কখনো ব্যতিক্রম হয়নি।"
"কেন?"
"প্রাণিবিদ্যায় আমরা জানি — মায়ের পেটে বাচ্চা আগে শোনে, পরে দেখে। আর কান কখনো বন্ধ হয় না — ঘুমের মধ্যেও কাজ করে, অন্ধকারেও, পিছন দিকেও।"
তিনি চশমা মুছলেন।
"আর সবচেয়ে বড় কথা — জ্ঞান কানের পথ দিয়েই আসে, দাদুভাই। মানুষ শুনে শেখে।"
সেই রাতে হুদহুদ বলল, "আজ শব্দ-পরীক্ষা নেই।"
"কেন?"
"কারণ আজকের আয়াতটাই একটা পরীক্ষা। শোনো।"
قُلْ هُوَ ٱلَّذِىٓ أَنشَأَكُمْ وَجَعَلَ لَكُمُ ٱلسَّمْعَ وَٱلْأَبْصَـٰرَ وَٱلْأَفْـِٔدَةَ ۖ قَلِيلًا مَّا تَشْكُرُونَ (কুল হুওয়াল্লাযী আনশাআকুম ওয়া জাআলা লাকুমুস সাম'আ ওয়াল আবসারা ওয়াল আফইদাহ · কালীলাম মা তাশকুরূন — বলুন, তিনিই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং দিয়েছেন শ্রবণ, দৃষ্টি ও অন্তর। তোমরা খুব অল্পই শুকরিয়া করো)
হুদহুদ থামল।
"তিনটে জিনিসের নাম শুনলে। ক্রমটা বলো তো।"
"ٱلسَّمْع — শ্রবণ। ٱلْأَبْصَار — দৃষ্টি। ٱلْأَفْـِٔدَة — অন্তর।"
"কোনটা আগে?"
"কান।"
মাহদী হঠাৎ সোজা হয়ে বসল।
"হুদহুদ! দাদা আজ ঠিক এই কথাটাই বলেছেন! বলেছেন কুরআনে কান সবসময় আগে!"
"তোমার দাদা ঠিক বলেছেন।" হুদহুদ ঝুঁটি ফোলাল। "আর তুমি আজ নিজের শরীর দিয়ে সেটা পরীক্ষা করেছ।"
"হ্যাঁ! চোখ বাঁধা থাকলে ভালো লাগছিল, কান বন্ধ থাকলে ভয়ংকর।"
"কারণ?"
মাহদী একটু ভাবল। "কারণ চোখ বন্ধ থাকলেও মানুষ আমার কাছে পৌঁছাতে পারে। কান বন্ধ থাকলে পারে না।"
হুদহুদ ধীরে ধীরে ডানা মেলল।
"সেনাপতি, এখন ক্লাস ৭৮-এর আয়াতটা মনে করো। জাহান্নামের লোকেরা কী বলেছিল?"
মাহদীর গা শিরশির করে উঠল।
"لَوْ كُنَّا نَسْمَعُ أَوْ نَعْقِلُ — যদি আমরা শুনতাম অথবা আক্কেল খাটাতাম।"
"আর আজকের আয়াতে আল্লাহ কী দিয়েছেন?"
মাহদী শব্দগুলো মিলিয়ে দেখল, আর তার চোখ বড় হয়ে গেল।
"سَمْع — শোনার জিনিস। আর أَفْـِٔدَة — বোঝার জিনিস!"
"একদম!" হুদহুদ লাফিয়ে উঠল। "যে দুইটা জিনিস না থাকলে তারা আফসোস করেছিল — আল্লাহ সেই দুইটাই তোমাকে আগে থেকেই দিয়ে রেখেছেন।"
"তাহলে অজুহাত..."
"...আর নেই।" হুদহুদ শান্তভাবে বলল।
তারপর সে শেষ শব্দগুলো পড়ল, খুব নরম করে: "قَلِيلًا مَّا تَشْكُرُونَ — তোমরা খুব অল্পই শুকরিয়া করো।"
"تَشْكُرُونَ," মাহদী বলল। "শুকরিয়া!"
"হ্যাঁ। আর ভাবো তো — আয়াতটা বলছে না তোমরা শুকরিয়া করো না। বলছে অল্প করো।"
"পার্থক্য কী?"
"পার্থক্য হলো — তুমি করো। শুধু কম করো।" হুদহুদ ডানা ভাঁজ করল। "আল্লাহ তোমাকে অস্বীকার করেননি, সেনাপতি। তিনি শুধু বলছেন — আরেকটু করা যায়।" 👂