🗺️ আজকের অভিযান
নানা আজ মাহদীকে নিয়ে গেছেন এমন এক জমিতে যেটা দেখে মাহদীর মন খারাপ হয়ে গেল।
মাটি ফেটে চৌচির। ধুলো উড়ছে। একটা ঘাসও নেই। মৃত জমি।
"নানা, এখানে আর কিছু হবে না, তাই না?"
নানা হাঁটু গেড়ে বসে এক মুঠো ধুলো তুলে নিলেন। আঙুলের ফাঁক দিয়ে ঝরে পড়তে দিলেন।
"তোমার বয়স কত, দাদুভাই?"
"নয়।"
"আমার বয়স তেষট্টি। আর আমি এই জমিটা তেত্রিশ বার মরতে দেখেছি।"
মাহদী মুখ তুলল।
"প্রতি বছর শুকনো মৌসুমে এইরকম হয়ে যায়। ফাটা, ধুলো, মরা। কেউ যদি প্রথমবার দেখে, সে শপথ করে বলবে এখানে আর কিছুই হবে না।"
"তারপর?"
নানা উঠে দাঁড়ালেন, হাতের ধুলো ঝাড়লেন।
"তারপর বৃষ্টি নামে। আর তিন সপ্তাহ পরে এই জায়গাটা এত সবুজ হয়ে যায় যে চোখ ধাঁধিয়ে যায়।"
তিনি নাতির দিকে তাকালেন।
"তেত্রিশ বার, মাহদী। আমি তেত্রিশ বার এই মরা মাটিকে বেঁচে উঠতে দেখেছি। তবু প্রতিবার অবাক হই।"
ফেরার পথে মাহদী চুপচাপ ছিল। তারপর হঠাৎ জিজ্ঞেস করল —
"নানা, মানুষ মরে যাওয়ার পর আবার জীবিত হবে কীভাবে?"
নানা হাঁটা থামালেন না। শুধু পেছনের জমিটার দিকে আঙুল তুললেন।
"ওইটা কীভাবে হয়, দাদুভাই?"
সেই রাতে হুদহুদ মাহদীকে নিয়ে গেল প্রাসাদের বারান্দায়। নিচে গোটা দ্বীপ দেখা যাচ্ছে।
"আগে শব্দ-পরীক্ষা। আজ সাতটা।"
"أَرْض?" — "আরদ, জমিন।"
"رَبّ?" — "প্রতিপালক।"
"كُلُوا۟?" — "কুলূ... খাও? أَكَلَ থেকে?"
"চমৎকার অনুমান — আর ঠিক!"
"مَشَىٰ?" — "জানি না।"
"হাঁটা। فَٱمْشُوا۟ মানে অতএব হাঁটো।"
"بَصِير?" — "সর্বদ্রষ্টা! بَصَر থেকে।"
"نَذِير?" — "সতর্ককারী।"
"ছয়ে ছয়, একটা নতুন।" হুদহুদ ঝুঁটি ফোলাল। "এবার আয়াত।"
هُوَ ٱلَّذِى جَعَلَ لَكُمُ ٱلْأَرْضَ ذَلُولًا فَٱمْشُوا۟ فِى مَنَاكِبِهَا وَكُلُوا۟ مِن رِّزْقِهِ (হুওয়াল্লাযী জাআলা লাকুমুল আরদা যালূলান ফামশূ ফী মানাকিবিহা ওয়া কুলূ মির রিযকিহি — তিনিই তোমাদের জন্য জমিনকে বশ করে দিয়েছেন; অতএব তোমরা এর কাঁধে-কাঁধে হাঁটো, আর তাঁর দেওয়া রিজিক থেকে খাও)
"ذَلُول (যালূল)," হুদহুদ বলল। "মানে বশ মানা, নরম — যেমন পোষা উট, যার পিঠে চড়া যায়।"
মাহদী ভুরু কুঁচকাল। "পৃথিবী পোষা?"
"ভেবে দেখো," হুদহুদ বলল। "তুমি মাটি খোঁড়ো — সে কিছু বলে না। বীজ ফেলো — সে গিলে নেয়, তারপর ফেরত দেয়। ঘর বানাও — সে ধরে রাখে। সে তো কামড়াতেও পারত।"
"আর مَنَاكِب (মানাকিব) মানে কাঁধ! আল্লাহ বলছেন পৃথিবীর কাঁধে হাঁটো।"
মাহদী হেসে ফেলল। "কাঁধে?"
"সবচেয়ে সুন্দর ছবিটা এখানেই, সেনাপতি।" হুদহুদ ডানা ভাঁজ করল। "যখন কোনো বড় ভাই ছোট ভাইকে কাঁধে তুলে নেয় — ছোটটা কি টের পায় সে কত উঁচুতে? সে তো শুধু হাসে।"
"পৃথিবী তোমাকে কাঁধে করে ঘুরছে, আর তুমি হাঁটছ।"
তারপর হুদহুদ আয়াতের শেষ শব্দটা পড়ল, আর সুরটা বদলে গেল।
وَإِلَيْهِ ٱلنُّشُورُ (ওয়া ইলাইহিন নুশূর — আর তাঁরই কাছে পুনরুত্থান)
"نُشُور," হুদহুদ বলল। "মানে ছড়িয়ে দেওয়া, বিছিয়ে দেওয়া — আর এখান থেকেই মানে দাঁড়ায় মরার পর আবার উঠে দাঁড়ানো।"
মাহদী স্থির হয়ে গেল।
"খেয়াল করেছ আয়াতের ক্রমটা?" হুদহুদ জিজ্ঞেস করল। "মাটি বশ হলো → তুমি হাঁটলে → তুমি খেলে → তারপর পুনরুত্থান।"
"আল্লাহ একই আয়াতে চাষ আর কিয়ামত পাশাপাশি রাখলেন। কেন বলো তো?"
মাহদী অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর আস্তে বলল — "কারণ... দুইটা একই জিনিস?"
হুদহুদ ধীরে ধীরে ডানা মেলল।
"আজ তোমার নানা তোমাকে কী দেখিয়েছেন?"
"একটা মরা জমি। বললেন তেত্রিশ বার মরতে দেখেছেন।"
"আর তুমি কী জিজ্ঞেস করেছিলে?"
মাহদীর গলা ধরে এল। "জিজ্ঞেস করেছিলাম — মানুষ মরার পর আবার জীবিত হবে কীভাবে।"
"আর তিনি কী উত্তর দিলেন?"
"কিছুই বলেননি। শুধু জমিটার দিকে আঙুল তুললেন।"
হুদহুদ অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
"মাহদী," সে শেষে বলল, "তোমার নানা সারাজীবন চাষ করেছেন। তোমার আব্বু কৃষিবিজ্ঞানী। তোমার আম্মু মাটিতে সেন্সর বসান।"
"তোমার গোটা পরিবার একটা কাজই করে — মরা মাটি থেকে প্রাণ বের করে আনে।"
"এখন ভাবো — আল্লাহ কুরআনে পুনরুত্থান বোঝানোর জন্য সবচেয়ে বেশি কোন উপমাটা ব্যবহার করেছেন?"
মাহদী মুখ তুলল, আর তার চোখ ভিজে এল।
"শুকনো জমি," সে ফিসফিস করে বলল। "আর বৃষ্টি।"
"তোমার উত্তরটা তোমার বাড়িতেই ছিল, সেনাপতি। নয় বছর ধরে চোখের সামনে।" 🌱