🗺️ আজকের অভিযান
বিকেলে আকাশ হঠাৎ কালো হয়ে গেল। বাতাস থেমে গেল একদম — এমন থেমে যাওয়া যে গা ছমছম করে।
নানা উঠান থেকে চেঁচিয়ে উঠলেন, "সবাই ভেতরে! শিলাবৃষ্টি আসছে!"
কয়েক সেকেন্ড পরেই শুরু হলো।
টিনের চালে এমন শব্দ যে কানে তালা লেগে যাওয়ার জোগাড়। বরফের গুলি — কোনোটা মার্বেলের মতো বড় — ছিটকে পড়ছে উঠানে, নালায়, গাছে।
মাহদী জানালা দিয়ে দেখল, উঠানের পেঁপে গাছটার পাতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে পড়ছে।
দশ মিনিট। তারপর সব থেমে গেল।
বাইরে বেরিয়ে মাহদী দেখল উঠান সাদা হয়ে আছে বরফে। আর নানার মুখ পাথর।
তাঁরা মাঠে গেলেন।
সরিষার ক্ষেতটা — যেটা তিন দিন পরে কাটা হতো — মাটির সাথে মিশে গেছে। পুরোটা।
নানা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। কিছু বললেন না।
তারপর নিচু হয়ে এক টুকরো বরফ তুলে নিলেন। হাতের তালুতে সেটা গলতে লাগল।
"চার মাসের কাজ, দাদুভাই," তিনি আস্তে বললেন। "দশ মিনিটে।"
মাহদীর গলা ধরে এল। "নানা, আপনি রাগ করছেন না?"
নানা হাতের পানিটা ঝেড়ে ফেললেন।
"কার উপর রাগ করব?" তিনি বললেন। "যিনি চার মাস ধরে গাছগুলো বড় করেছিলেন, আজ তিনিই বরফ পাঠিয়েছেন।"
তারপর যোগ করলেন — "আর একটা কথা মনে রেখো। আমরা রোজ ভাবি সব আমাদের হাতে। আজ দশ মিনিট লাগল ভুলটা ভাঙতে।"
সেই রাতে দ্বীপে হুদহুদের গলা গম্ভীর।
"আজকের দুইটা আয়াত প্রশ্ন দিয়ে শুরু। আর প্রশ্নটা কড়া।"
ءَأَمِنتُم مَّن فِى ٱلسَّمَآءِ أَن يَخْسِفَ بِكُمُ ٱلْأَرْضَ فَإِذَا هِىَ تَمُورُ (আআমিনতুম মান ফিস সামাই আন ইয়াখসিফা বিকুমুল আরদা ফাইযা হিয়া তামূর — তোমরা কি নির্ভয় হয়ে গেছ যে, আসমানে যিনি আছেন তিনি তোমাদেরসহ জমিনকে ধসিয়ে দেবেন? তখন তা থরথর করে কাঁপতে থাকবে)
"ءَأَمِنتُم — তোমরা কি নিরাপদ বোধ করছ?" হুদহুদ বলল। "পরিবারটা ء م ن।"
মাহদী থমকে গেল। "এটা তো... ঈমান-এর পরিবার!"
"দারুণ ধরেছ, সেনাপতি!" হুদহুদ ডানা ঝাপটাল। "أَمْن মানে নিরাপত্তা। إِيمَان মানে বিশ্বাস। مُؤْمِن মানে বিশ্বাসী। أَمَانَة মানে আমানত। আর নামাজ শেষে তুমি বলো — আমীন!"
"সবগুলো এক পরিবার?"
"সবগুলো। আর এইখানেই সবচেয়ে সুন্দর কথাটা — ঈমান আর নিরাপত্তা একই শব্দ থেকে এসেছে। কারণ যে সত্যিই বিশ্বাস করে, সে-ই সবচেয়ে নিরাপদ।"
তারপর হুদহুদ পরের আয়াতটা পড়ল:
أَمْ أَمِنتُم مَّن فِى ٱلسَّمَآءِ أَن يُرْسِلَ عَلَيْكُمْ حَاصِبًا (আম আমিনতুম মান ফিস সামাই আন ইউরসিলা আলাইকুম হাসিবা — অথবা তোমরা কি নির্ভয় হয়ে গেছ যে, আসমানে যিনি আছেন তিনি তোমাদের উপর কংকরবর্ষী ঝড় পাঠাবেন?)
"حَاصِب (হাসিব)," হুদহুদ বলল। "মানে এমন ঝড় যা পাথর বা কাঁকর ছুঁড়ে মারে।"
মাহদী স্থির হয়ে গেল।
তার কানে টিনের চালের সেই শব্দটা ফিরে এল।
"হুদহুদ," সে আস্তে বলল, "আজ বিকেলে আকাশ থেকে আমাদের উপর পাথর পড়েছে।"
হুদহুদ মাথা ঘোরাল। "কী?"
"শিলাবৃষ্টি। দশ মিনিট। নানার চার মাসের সরিষা শেষ।"
হুদহুদ অনেকক্ষণ কিছু বলল না।
"তোমার নানা কী বললেন?"
"বললেন — যিনি চার মাস ধরে গাছগুলো বড় করেছিলেন, আজ তিনিই বরফ পাঠিয়েছেন।"
হুদহুদ ধীরে ধীরে ঝুঁটিটা নামাল — যেন সালাম করছে।
"তোমার নানা আজ যা বলেছেন, মাহদী, সেটা বহু আলেম বই লিখে বোঝাতে পারেন না।"
"তাহলে আয়াতটা কি ভয় দেখাচ্ছে?"
"না। আয়াতটা ঘুম ভাঙাচ্ছে।" হুদহুদ বলল। "শব্দটা খেয়াল করো — ءَأَمِنتُم, তোমরা কি নির্ভয় হয়ে গেছ? আল্লাহ বলছেন না ভয় পাও। বলছেন — নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থেকো না।"
"পার্থক্যটা কী?"
"ভয় মানুষকে জমিয়ে দেয়। সতর্কতা মানুষকে জাগিয়ে রাখে।"
তারপর সে শেষ কথাটা যোগ করল:
وَلَقَدْ كَذَّبَ ٱلَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ فَكَيْفَ كَانَ نَكِيرِ (ওয়ালাকাদ কায্যাবাল্লাযীনা মিন কাবলিহিম ফাকাইফা কানা নাকীর — আর তাদের আগের লোকেরাও মিথ্যারোপ করেছিল; তারপর কেমন হয়েছিল আমার প্রত্যাখ্যান!)
"كَذَّبَ," মাহদী আস্তে বলল। "আবার।"
"আবার।" হুদহুদ ডানা ভাঁজ করল। "এই শব্দটা এখন তুমি ঘুমিয়েও চিনতে পারো, তাই না?" ❄️