🗺️ আজকের অভিযান
সকালে মসজিদের মাইকে ঘোষণা হলো — পাড়ার করিম চাচা রাতে ইন্তেকাল করেছেন।
মাহদী চাচাকে চিনত। রিকশা চালাতেন, আর জুমার দিন সবসময় প্রথম কাতারে দাঁড়াতেন।
জানাজায় ভিড় হলো।
ফেরার পথে মাহদী শুনল দুইজন লোক কথা বলছেন।
একজন বললেন, "চাচা তো ভালো মানুষ ছিলেন। জান্নাতে যাবেন নিশ্চিত।"
আরেকজন বললেন, "কে জানে ভাই। মানুষের ভেতরের খবর কে রাখে।"
বাড়ি ফিরে মাহদী দাদাকে জিজ্ঞেস করল, "দাদা, করিম চাচা কি জান্নাতে যাবেন?"
দাদা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
"দাদুভাই, আমি চল্লিশ বছর অধ্যাপনা করেছি, আর এই প্রশ্নের উত্তর আমি জানি না। কেউ জানে না।"
"তাহলে আমরা কী বলব?"
"আমরা যা বলি সেটাই বলব — মরহুম করিম চাচা।"
"মরহুম মানে কী?"
দাদা মুখ তুললেন।
"শব্দটা এসেছে رَحْمَة থেকে। মরহুম মানে — যাঁর প্রতি আল্লাহ দয়া করেছেন।"
মাহদী থমকে গেল।
"খেয়াল করো দাদুভাই — আমরা বলি না জান্নাতি করিম চাচা। আমরা বলি মরহুম। আমরা রায় দিই না — আমরা দয়া চাই।"
তিনি চশমা মুছলেন।
"আর নিজের ব্যাপারেও একই কথা। যে বলে আমি নিশ্চিত জান্নাতে যাব — সে আসলে জানে না সে কী বলছে।"
"তাহলে ভয় নিয়ে থাকতে হবে?"
"না।" দাদা মাথা নাড়লেন। "ভয় আর আশা — দুই ডানা, মনে আছে? আমরা আশা করি, কিন্তু নিশ্চয়তা দাবি করি না।"
সেই রাতে দ্বীপে হুদহুদ মাহদীকে নিয়ে বসল।
"আজকের দুইটা আয়াত," সে বলল। "আর দ্বিতীয়টা শুনে তুমি চমকে যাবে — কারণ ওখানে নবীজি (সা.) নিজের কথা বলছেন।"
প্রথম আয়াত: فَلَمَّا رَأَوْهُ زُلْفَةً سِيٓـَٔتْ وُجُوهُ ٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ (ফালাম্মা রাআওহু যুলফাতান সীআত উজূহুল্লাযীনা কাফারূ — অতঃপর তারা যখন তা আসন্ন দেখবে, তখন কাফিরদের চেহারা ম্লান হয়ে যাবে)
"زُلْفَة মানে খুব কাছে," হুদহুদ বলল। "আর وُجُوه মানে চেহারাসমূহ — মনে আছে وَجْه? গতকালের আয়াতে ছিল, মুখ থুবড়ে।"
"মনে আছে।"
"এবার দ্বিতীয় আয়াত। মন দিয়ে শোনো।"
قُلْ أَرَءَيْتُمْ إِنْ أَهْلَكَنِىَ ٱللَّهُ وَمَن مَّعِىَ أَوْ رَحِمَنَا فَمَن يُجِيرُ ٱلْكَـٰفِرِينَ مِنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ (কুল আরাআইতুম ইন আহলাকানিয়াল্লাহু ওয়া মাম মাইয়া আও রাহিমানা · ফামাই ইউজীরুল কাফিরীনা মিন আযাবিন আলীম — বলুন: তোমরা ভেবে দেখেছ কি — যদি আল্লাহ আমাকে ও আমার সঙ্গীদের ধ্বংস করেন, অথবা আমাদের প্রতি দয়া করেন, তবে কাফিরদের কে রক্ষা করবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থেকে?)
মাহদী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, "হুদহুদ... নবীজি (সা.) নিজের ব্যাপারেও নিশ্চয়তা দিচ্ছেন না?"
হুদহুদ ধীরে মাথা নাড়ল।
"এইটাই আজকের পাঠ, সেনাপতি। আল্লাহ তাঁকে বলতে বললেন — আল্লাহ যদি আমাকে ধ্বংস করেন অথবা আমাদের প্রতি দয়া করেন।"
"পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানিত মানুষটি — আর তিনিও নিজের ব্যাপারে দাবি করছেন না।"
মাহদীর গলা ধরে এল।
"হুদহুদ, আজ সকালে আমাদের পাড়ার করিম চাচা মারা গেছেন। জানাজার পর একজন বললেন উনি নিশ্চিত জান্নাতে যাবেন।"
"আর তোমার দাদা কী বললেন?"
"বললেন আমরা রায় দিই না। আমরা বলি মরহুম — যাঁর প্রতি আল্লাহ দয়া করেছেন।"
হুদহুদ ঝুঁটি নামিয়ে নিল — যেন সম্মান জানাচ্ছে।
"তোমার দাদা আজ তোমাকে একটা গোটা পরিবার শিখিয়ে দিয়েছেন।" সে বলল। "ر ح م।"
"বলো তো, এই পরিবারের কে কে?"
মাহদী গুনতে লাগল। "রহমত... আর-রাহমান... আর-রাহীম..."
"আর?"
"মরহুম!"
"আর আজকের আয়াতে?"
"رَحِمَنَا — তিনি আমাদের প্রতি দয়া করেন!"
"শাবাশ।" হুদহুদ ডানা ভাঁজ করল। "আর একটা কথা তোমার দাদা হয়তো বলেননি। আরবিতে মায়ের গর্ভকে বলে رَحِم — এই একই পরিবার।"
মাহদী স্থির হয়ে গেল।
"আল্লাহর দয়া আর মায়ের গর্ভ — এক শব্দ থেকে?"
"এক শব্দ থেকে।" হুদহুদ নরম গলায় বলল। "নবীজি (সা.) একবার একজন মাকে দেখেছিলেন নিজের বাচ্চাকে বুকে জড়িয়ে ধরতে। তিনি সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন — এই মা কি কখনো নিজের বাচ্চাকে আগুনে ফেলে দিতে পারেন?"
"সাহাবিরা বললেন — কক্ষনো না।"
"তখন তিনি বললেন — আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি এই মায়ের চেয়েও বেশি দয়ালু।"
📚 সহীহ বুখারী ৫৯৯৯, সহীহ মুসলিম ২৭৫৪
দুজনে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
"হুদহুদ, তাহলে করিম চাচার জন্য আমি কী করব?"
হুদহুদ ডানা মেলল।
"যা তুমি করতে পারো, সেটাই করো। দোয়া করো।"
"আর যা তুমি পারো না — রায় দেওয়া — সেটা তাঁর কাছেই রেখে দাও, যিনি মায়ের চেয়েও দয়ালু।" 🤍