🗺️ আজকের অভিযান
দাদা আজ ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন, হাতে দূরবীন।
"দাদা, কী দেখছেন?"
"চিল।" দাদা দূরবীনটা এগিয়ে দিলেন। "দেখো।"
মাহদী দেখল — একটা চিল অনেক উঁচুতে গোল হয়ে ঘুরছে। ডানা একদম মেলা, স্থির।
"দাদা, ও ডানা ঝাপটাচ্ছে না!"
"না। ওটাই তো ব্যাপার।" দাদা চেয়ার টেনে বসলেন। "গুনতে থাকো। কতক্ষণ ডানা না নেড়ে থাকে।"
মাহদী গুনল। এক মিনিট। দুই মিনিট। চিলটা একবারও ডানা নাড়ল না — শুধু ধীরে ধীরে উঁচুতে উঠতে লাগল।
"এটা কীভাবে হয় দাদা?"
"গরম বাতাস উপরে ওঠে, দাদুভাই। পাখিটা সেই উঠন্ত বাতাসের উপর ভেসে থাকে। এর নাম থার্মাল।"
"তার মানে বিজ্ঞানে ব্যাখ্যা আছে?"
"আছে। অনেকটাই আছে।" দাদা চশমা মুছলেন। "ডানার আকৃতি, পালকের গঠন, ফাঁপা হাড় — সব মাপা যায়।"
তারপর তিনি থামলেন।
"তিন ভাগে শোনো, দাদুভাই। আজকেরটা সবচেয়ে গভীর।"
"এক — কুরআন যা বলেছে। পাখিদের ধরে রাখেন কেবল আর-রাহমান।"
"দুই — বিজ্ঞান যা বলে। বাতাসের চাপ, ডানার বাঁক, অভিকর্ষ — সবই আছে, সবই মাপা যায়। আর আমরা এখনো পাখির মতো একটা যন্ত্র বানাতে পারিনি — চেষ্টা চলছে।"
"তিন — আর এইটা মন দিয়ে শোনো।" দাদা দূরবীনটা নামিয়ে রাখলেন।
"অনেকে ভাবে — ব্যাখ্যা পেয়ে গেছি, তাই আল্লাহর দরকার ফুরিয়ে গেল। এটাই সবচেয়ে বড় ভুল।"
"কেন দাদা?"
"কারণ কীভাবে হয় আর কে করেন — এই দুইটা আলাদা প্রশ্ন।"
তিনি সামনে ঝুঁকলেন।
"তুমি যদি আমাকে জিজ্ঞেস করো ভাত কীভাবে রান্না হয়, আমি বলব — তাপ, পানি, স্টার্চ। কিন্তু তাতে কি প্রমাণ হয় রাঁধুনি নেই?"
মাহদী হেসে ফেলল।
"বিজ্ঞান রান্নার পদ্ধতি বলে, দাদুভাই। রাঁধুনি কে, সেটা বলে না।"
সেই রাতে দ্বীপে হুদহুদ মাহদীকে নিয়ে গেল প্রাসাদের সবচেয়ে উঁচু ছাদে।
"আজকের আয়াত পড়ার আগে," সে বলল, "একটা কাজ করো। আমার দিকে তাকাও।"
মাহদী তাকাল।
হুদহুদ ডানা দুটো মেলে দিল — সম্পূর্ণ। তারপর ভেসে রইল, বাতাসে স্থির, একটুও না নড়ে।
তারপর হঠাৎ ডানা গুটিয়ে নিল, আর নেমে এসে মাহদীর কাঁধে বসল।
"এবার আয়াতটা শোনো।"
أَوَلَمْ يَرَوْا۟ إِلَى ٱلطَّيْرِ فَوْقَهُمْ صَـٰٓفَّـٰتٍ وَيَقْبِضْنَ (আওয়ালাম ইয়ারাও ইলাত তাইরি ফাওকাহুম সাফ্ফাতিও ওয়া ইয়াকবিদনা — তারা কি উপরে পাখিদের দিকে তাকায় না — যারা ডানা মেলে ধরে, আবার গুটিয়ে নেয়?)
মাহদীর গায়ে কাঁটা দিল।
"তুমি এইমাত্র... আয়াতটা করে দেখালে।"
"করলাম।" হুদহুদ ঝুঁটি নাড়ল। "আর শব্দটা খেয়াল করেছ? صَـٰٓفَّـٰت।"
মাহদী চেঁচিয়ে উঠল। "সূরা আস-সাফফাত! ফেরেশতাদের সারি! আর সফ সোজা করুন!"
"একই শব্দ, সেনাপতি।" হুদহুদ বলল। "صَفّ মানে সারিবদ্ধ হওয়া, মেলে ধরা। ফেরেশতারা সারি বাঁধেন, তুমি নামাজে সফে দাঁড়াও, আর পাখি আকাশে ডানা মেলে ধরে — একই শব্দ, তিন জায়গায়।"
"আর يَقْبِضْنَ মানে গুটিয়ে নেওয়া।"
তারপর হুদহুদ আয়াতের বাকিটা পড়ল, আর গলাটা নরম হয়ে এল:
مَا يُمْسِكُهُنَّ إِلَّا ٱلرَّحْمَـٰنُ ۚ إِنَّهُۥ بِكُلِّ شَىْءٍۭ بَصِيرٌ (মা ইউমসিকুহুন্না ইল্লার রাহমান · ইন্নাহু বিকুল্লি শাইইম বাসীর — তাদের ধরে রাখেন কেবল আর-রাহমান; নিশ্চয়ই তিনি সবকিছুর সম্যক দ্রষ্টা)
"يُمْسِكُ মানে ধরে রাখা, হাতে ধরে থাকা।"
মাহদী উপরে তাকিয়ে রইল।
"হুদহুদ, আজ দাদা বলেছেন পাখি ওড়ার বিজ্ঞান আছে। বাতাসের চাপ, ডানার আকৃতি..."
"তোমার দাদা ঠিক বলেছেন।"
"তাহলে আয়াতটা কি ভুল?"
হুদহুদ ডানা ভাঁজ করে সোজা হয়ে বসল।
"বলো তো — তুমি যে এখন দাঁড়িয়ে আছ, পড়ে যাচ্ছ না কেন?"
"মাধ্যাকর্ষণ। আর আমার পায়ের হাড়।"
"ঠিক। তাহলে কে তোমাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন?"
মাহদী থেমে গেল।
"মাধ্যাকর্ষণটা কে বানিয়েছেন, মাহদী? হাড়টা কে বানিয়েছেন? আর প্রতি সেকেন্ডে ওটা যে কাজ করেই যাচ্ছে — কে চালাচ্ছেন?"
"আয়াতটা বাতাসের চাপ অস্বীকার করছে না, সেনাপতি। আয়াতটা বলছে বাতাসের চাপটাও তাঁরই হাত।"
মাহদী দাদার কথাটা ভাবল। বিজ্ঞান রান্নার পদ্ধতি বলে। রাঁধুনি কে, সেটা বলে না।
তারপর হুদহুদ শেষ আয়াতটা পড়ল — আর আজ প্রথমবার তার গলায় হাসি:
أَمَّنْ هَـٰذَا ٱلَّذِى هُوَ جُندٌ لَّكُمْ يَنصُرُكُم مِّن دُونِ ٱلرَّحْمَـٰنِ (আম্মান হাযাল্লাযী হুওয়া জুনদুল লাকুম ইয়ানসুরুকুম মিন দূনির রাহমান — এমন কে আছে যে তোমাদের সৈন্যবাহিনী হয়ে আর-রাহমান ছাড়া তোমাদের সাহায্য করবে?)
"جُند," হুদহুদ বলল। "মানে সৈন্যবাহিনী।"
মাহদী সোজা হয়ে দাঁড়াল।
"আর يَنصُرُ — মনে আছে?"
"সূরা নাসর! নাসরুল্লাহি ওয়াল ফাতহ!"
"আর মদিনার মানুষদের কী বলা হতো?"
"আনসার!"
"আর বাংলাদেশে একটা বাহিনীর নাম?"
মাহদী হেসে ফেলল। "আনসার বাহিনী!"
হুদহুদ ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে হাসল। তারপর হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল।
"এবার একটা প্রশ্ন, সেনাপতি। তোমাকে জ্ঞানের একটা সেনাবাহিনী দেওয়া হয়েছিল, মনে আছে?"
"মনে আছে।"
"আয়াতটা বলছে আর-রাহমান ছাড়া কোনো বাহিনী কাজে আসে না। তাহলে তোমার বাহিনীটা কার?"
মাহদী উপরে তাকাল। আকাশে হুদহুদের মতো আরও অনেক পাখি — কেউ ডানা মেলছে, কেউ গুটিয়ে নিচ্ছে।
"তাঁরই," সে বলল। "আমাকে শুধু ধার দেওয়া হয়েছে।"
হুদহুদ কিছু বলল না।
শুধু ডানা মেলে উড়ে গেল — আর অনেকক্ষণ ভেসে রইল, একবারও না নেড়ে। 🦅