🗺️ আজকের অভিযান
শুক্রবার দুপুর। বাড়িতে কেউ নেই।
আম্মু গেছেন ফার্মে, দাদা মসজিদে, তাসমিয়া নানুবাড়ি, দাদি প্রতিবেশীর বাড়ি।
মাহদী একা। আর তার হাতে আম্মুর পুরনো ট্যাব — কার্টুন চলছে।
আসরের আজান হলো।
মাহদী আজানটা শুনল। কার্টুনটা তখন সবচেয়ে মজার জায়গায়।
সে ভাবল — কেউ তো নেই। কেউ জিজ্ঞেসও করবে না। পরে পড়ে নেব।
তারপর ভাবল — একদম কেউ নেই?
সে ট্যাবটা উল্টে রেখে দিল।
ওজু করল। জায়নামাজ পাতল। খালি ঘরে একা একা আসর পড়ল।
নামাজ শেষে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো — যেন ঘরটা আগের চেয়ে বড় লাগছে।
সন্ধ্যায় সবাই ফিরল। কেউ জিজ্ঞেস করল না নামাজ পড়েছে কি না।
মাহদীও বলল না।
কিন্তু রাতে বিছানায় শুয়ে তার মনে হলো — আজকের নামাজটা অন্য সব নামাজের চেয়ে আলাদা ছিল।
সেই রাতে হুদহুদ মাহদীকে ফটকের কাছে নিয়ে গেল না।
সে নিয়ে গেল উল্টো দিকে — সেই সরু আলোর পথটার দিকে।
"আজ শেষ দুইটা আয়াত," সে বলল। "আর আজ দ্বীপটা শেষ হবে।"
প্রথম আয়াত: فَٱعْتَرَفُوا۟ بِذَنۢبِهِمْ فَسُحْقًا لِّأَصْحَـٰبِ ٱلسَّعِيرِ (ফা'তারাফূ বিযাম্বিহিম ফাসুহকাল লিআসহাবিস সাঈর — অতঃপর তারা তাদের অপরাধ স্বীকার করবে। সুতরাং ধ্বংস জ্বলন্ত আগুনের অধিবাসীদের জন্য)
"ٱعْتَرَفُوا۟ মানে স্বীকার করল," হুদহুদ বলল। "আর ذَنْب — মনে আছে?"
"গুনাহ।"
"খেয়াল করেছ, ওরা তর্ক করেনি? অজুহাত দেয়নি? শেষ পর্যন্ত সবাই স্বীকার করে ফেলে, মাহদী।"
"তাহলে স্বীকার করেও লাভ হলো না?"
"এখানেই আজকের সবচেয়ে বড় পাঠ।" হুদহুদ থামল। "স্বীকার করার একটা সময় আছে।"
"সময় পার হয়ে গেলে?"
"তখন সেটা আর তাওবা নয় — শুধু আফসোস।"
মাহদী চুপ করে রইল।
তারপর হুদহুদ ঘুরে দাঁড়াল, আর তার গলাটা পুরো বদলে গেল।
"এবার শোনো। এই দ্বীপের শেষ আয়াত। আর এইটার জন্যই আমি তোমাকে চার সপ্তাহ ধরে টেনে এনেছি।"
إِنَّ ٱلَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُم بِٱلْغَيْبِ لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ كَبِيرٌ (ইন্নাল্লাযীনা ইয়াখশাওনা রব্বাহুম বিল গইবি লাহুম মাগফিরাতুও ওয়া আজরুন কাবীর — নিশ্চয়ই যারা না-দেখা অবস্থায় তাদের রবকে ভয় করে, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার)
আর ঠিক তখনই সরু আলোর পথটা চওড়া হয়ে গেল।
মাহদী দাঁড়িয়ে রইল।
"بِٱلْغَيْبِ," সে ফিসফিস করে বলল।
"হ্যাঁ।" হুদহুদ বলল। "চিনতে পেরেছ শব্দটা?"
"ক্লাস ৫৯। গায়েব — অদৃশ্য। সূরা বাকারার তৃতীয় আয়াত।"
"আর গোটা এই দ্বীপটা কী নিয়ে ছিল?"
"অদৃশ্য জিনিস। জিন, ফেরেশতা, সাত আসমান..."
"আর আজ শেষ আয়াতে আল্লাহ শব্দটা আবার আনলেন।" হুদহুদ ডানা ভাঁজ করল। "কিন্তু আজ অন্য অর্থে। আজ بِٱلْغَيْبِ মানে — যখন কেউ দেখছে না।"
মাহদীর বুকের ভেতর কিছু একটা নড়ে উঠল।
"আল্লাহকে ভয় করা সহজ, মাহদী — যখন মসজিদ ভর্তি মানুষ। যখন হুজুর তাকিয়ে আছেন। যখন আম্মু দরজায়।"
"কিন্তু যখন খালি ঘরে তুমি একা? যখন কেউ কোনোদিন জানবেই না?"
হুদহুদ মাহদীর দিকে সোজা তাকাল।
"তখন যা করো, সেটাই তুমি।"
মাহদী কিছু বলল না।
কিন্তু হুদহুদ তার মুখের দিকে তাকিয়ে মাথা কাত করল।
"আজ দুপুরে কিছু হয়েছিল?"
মাহদী মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। "...বাড়িতে কেউ ছিল না।"
"আর?"
"আর আসরের আজান হলো।"
হুদহুদ অপেক্ষা করল।
"আমি ট্যাবটা উল্টে রেখে নামাজ পড়েছি।"
অনেকক্ষণ কেউ কিছু বলল না।
তারপর হুদহুদ ডানা মেলে ধরল — আর আলোর পথটা এত উজ্জ্বল হয়ে উঠল যে মাহদীকে চোখ কুঁচকাতে হলো।
"তাহলে আজকের আয়াতটা তোমার নামে লেখা, সেনাপতি।"
"আর জানো পুরস্কারটা কী? مَغْفِرَة (মাগফিরাহ — ক্ষমা) আর أَجْرٌ كَبِير (আজরুন কাবীর — মহাপুরস্কার)।"
"مَغْفِرَة শব্দটার মানে জানো? ঢেকে দেওয়া।"
মাহদী চমকে উঠল। "কিন্তু كَفَرَ-ও তো ঢেকে দেওয়া!"
"দারুণ!" হুদহুদ লাফিয়ে উঠল। "দুইটাই ঢাকা — তফাত শুধু কে ঢাকছে আর কী ঢাকছে। মানুষ ঢাকে সত্যকে — সেটা কুফর। আল্লাহ ঢাকেন তোমার গুনাহকে — সেটা মাগফিরাত।"
"আর আরবিতে সৈনিকের শিরস্ত্রাণকেও বলে مِغْفَر — যা মাথা ঢেকে রক্ষা করে।"
হুদহুদ ডানা নামিয়ে নরম গলায় বলল —
"চার সপ্তাহ আগে তুমি এই ঝাপসা দ্বীপে নেমেছিলে, মাহদী। ভয় পেয়েছিলে।"
"আর আজ দ্বীপটা তোমাকে বিদায় দিচ্ছে একটা শিরস্ত্রাণ দিয়ে।" 🛡️