🗺️ আজকের অভিযান
বিকেলে মাহদী আর সাব্বিরের মধ্যে তুমুল তর্ক লেগে গেল।
বিষয়টা ছোট — মাঠের কোন পাশে উইকেট হবে। কিন্তু দুজনেই এত জোরে চেঁচাচ্ছিল যে পাশের বাড়ি থেকে লোক বেরিয়ে এল।
শেষে সাব্বির ব্যাট ফেলে চলে গেল। খেলা হলো না।
সন্ধ্যায় মাহদী দাদার ঘরে গিয়ে বসল, মুখ ভার।
"কী হয়েছে?"
মাহদী পুরো ঘটনাটা বলল।
দাদা শুনলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, "সাব্বির কী বলতে চাইছিল?"
মাহদী মুখ খুলল... আর থেমে গেল।
"জানি না," সে শেষে বলল। "আমি শুনিনি।"
"তুমি কী করছিলে তাহলে?"
"...আমি ভাবছিলাম এরপর আমি কী বলব।"
দাদা চশমাটা খুলে টেবিলে রাখলেন।
"দাদুভাই, আমি চল্লিশ বছর ক্লাসরুমে কাটিয়েছি। আর একটা জিনিস শিখেছি — বেশিরভাগ ঝগড়া মতের পার্থক্যে হয় না। হয় কেউ শোনে না বলে।"
তিনি আঙুল তুলে তিনটে ধাপ গুনলেন।
"একটা নিয়ম মনে রাখো, আর সারাজীবন কাজে লাগবে। শোনো → ভাবো → তারপর বলো।"
"এই ক্রমটা উল্টালে কী হয়?"
"বলো → শোনো → তারপর ভাবো।" দাদা হাসলেন। "আর সেটাকেই বলে ঝগড়া।"
সেই রাতে হুদহুদ মাহদীকে আবার সেই ফটকের কাছে নিয়ে গেল।
"আজ তুমি ওদের উত্তরটা শুনবে," সে বলল। "কাল রক্ষীরা প্রশ্ন করেছিল। আজ জবাব।"
ফটকের সামনে দাঁড়ানো দলটা মাথা নিচু করে বলল:
قَالُوا۟ بَلَىٰ قَدْ جَآءَنَا نَذِيرٌ فَكَذَّبْنَا (কালূ বালা কাদ জাআনা নাযীরুন ফাকায্যাবনা — তারা বলবে: হ্যাঁ, অবশ্যই আমাদের কাছে সতর্ককারী এসেছিল, কিন্তু আমরা মিথ্যারোপ করেছিলাম)
মাহদী চমকে উঠল।
"بَلَىٰ," হুদহুদ বলল। "মানে হ্যাঁ, এসেছিল। ওরা মিথ্যা বলল না, মাহদী। ওরা স্বীকার করে নিল।"
"আর فَكَذَّبْنَا?"
মাহদীর গলা শুকিয়ে গেল। "কায্যাবনা... আমরা মিথ্যা বলেছিলাম। সেই পরিবার।"
"সেই পরিবার," হুদহুদ মাথা নাড়ল। "যেখানেই পতন, সেখানেই এই শব্দ।"
তারপর হুদহুদ থেমে গেল। ঝুঁটিটা কেঁপে উঠল।
"এবার পরের আয়াতটা শোনো, মাহদী। আর মন দিয়ে শোনো — কারণ এই বইয়ের গোটা কথাটাই এই এক লাইনে আছে।"
وَقَالُوا۟ لَوْ كُنَّا نَسْمَعُ أَوْ نَعْقِلُ مَا كُنَّا فِىٓ أَصْحَـٰبِ ٱلسَّعِيرِ (ওয়া কালূ লাও কুন্না নাসমাউ আও না'কিলু মা কুন্না ফী আসহাবিস সাঈর — আর তারা বলবে: যদি আমরা শুনতাম অথবা বুদ্ধি খাটাতাম, তাহলে আমরা জ্বলন্ত আগুনের অধিবাসী হতাম না)
মাহদী নিশ্চুপ।
"দুইটা শব্দ," হুদহুদ বলল। "শুধু দুইটা। نَسْمَعُ আর نَعْقِلُ।"
"نَسْمَعُ — মনে আছে?"
"সামিআ! শোনা।"
"আর نَعْقِلُ — পরিবার ع ق ل। মানে বুদ্ধি খাটানো, জোড়া লাগানো, চিন্তা করা।"
হুদহুদ মাথা কাত করল। "বাংলায় কী বলো যখন কেউ বোকামি করে?"
মাহদী কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর তার চোখ বড় হয়ে গেল।
"আক্কেল! তোর আক্কেল নেই?"
"একদম সেই শব্দ, সেনাপতি!" হুদহুদ ডানা ঝাপটে লাফাতে লাগল। "عَقْل থেকেই আক্কেল! তুমি রোজ ব্যবহার করো!"
তারপর সে শান্ত হলো।
"এখন ভেবে দেখো, মাহদী। জাহান্নামের লোকেরা কী বলছে? তারা বলছে না যদি আমরা বেশি নামাজ পড়তাম। বলছে না যদি আমরা বেশি দান করতাম।"
"তারা বলছে — যদি আমরা শুনতাম, অথবা আক্কেল খাটাতাম।"
"কেন এই দুইটা?"
"কারণ এই দুইটাই সব কিছুর শুরু।" হুদহুদ বলল। "যে শোনে না, সে জানবে কীভাবে? আর যে জেনে চিন্তা করে না, সে মানবে কীভাবে?"
মাহদীর বিকেলের কথা মনে পড়ল। সাব্বির কী বলতে চাইছিল? — জানি না। আমি শুনিনি।
"হুদহুদ," সে আস্তে বলল। "আজ বিকেলে আমি শুনিনি।"
"কী শুনোনি?"
"বন্ধুর কথা। আমি ভাবছিলাম আমি কী বলব।"
হুদহুদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
"তাহলে আজকের আয়াতটা তোমাকে দুইবার ধরেছে, মাহদী।"
"দুইবার?"
"একবার কিয়ামতের ফটকে। আর একবার সাতক্ষীরার ক্রিকেট মাঠে।"
সে ডানা মেলল।
"আর একটা কথা — খেয়াল করেছ, আল্লাহ শোনা আর বোঝা-কে জান্নাত-জাহান্নামের সাথে জুড়ে দিয়েছেন?"
"হ্যাঁ।"
"তাহলে বুঝে নাও — তুমি যে বইটা পড়ছ, ওটা শুধু আরবি শেখার বই নয়। ওটা শোনা আর বোঝার প্রশিক্ষণ।" 🧠