🗺️ আজকের অভিযান
দাদা আজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটা লম্বা কালো বাক্স নিয়ে এসেছেন।
"এটা কী দাদা?"
"পুরনো বন্ধু।" দাদা বাক্সটা খুললেন। ভেতরে পিতলের নল, তিনপায়া স্ট্যান্ড। টেলিস্কোপ।
রাতে ছাদে বসানো হলো। দাদা নলটা তাক করলেন চাঁদের দিকে, তারপর সরে দাঁড়ালেন।
"দেখো।"
মাহদী চোখ লাগাল — আর প্রায় চিৎকার করে উঠল।
চাঁদের গায়ে গর্ত। শত শত গর্ত, পাহাড়, ছায়া। খালি চোখে যেটা মসৃণ সাদা থালা, সেটা আসলে একটা গোটা পৃথিবী।
"দাদা! এত কিছু আছে ওখানে!"
"চারশো বছর আগে গ্যালিলিও প্রথম এটা দেখেছিলেন," দাদা বললেন। "তারপর থেকে মানুষ তাকিয়েই আছে।"
"কী খুঁজছে?"
দাদা চেয়ার টেনে বসলেন।
"সব রকম জিনিস। কিন্তু একটা জিনিস মানুষ বারবার খুঁজেছে, দাদুভাই — ভুল।"
"ভুল?"
"হ্যাঁ। বিজ্ঞানের কাজই তো তাই — নিয়মের ব্যতিক্রম খোঁজা, হিসাবের গরমিল খোঁজা। কোথাও যদি একটা ফাটল পাওয়া যায়, সেখান থেকেই নতুন আবিষ্কার শুরু হয়।"
"চারশো বছরে কী পেয়েছে?"
দাদা টেলিস্কোপের গায়ে হাত রাখলেন।
"অনেক কিছু পেয়েছে। নতুন গ্রহ, নতুন ছায়াপথ, নতুন নিয়ম।" তিনি থামলেন। "কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ বলতে পারেনি মহাবিশ্বটা কোথাও ভেঙে পড়ছে। যত দূরেই তাকাক — নিয়ম একই, হিসাব মেলে।"
তিনি নাতির দিকে তাকালেন।
"এখন খুব সাবধানে শোনো, তিন ভাগে।"
"এক — কুরআন যা বলেছে। আবার তাকাও, কোনো ফাটল দেখতে পাও? এটা একটা চ্যালেঞ্জ, আর চ্যালেঞ্জটা এখনো দাঁড়িয়ে আছে।"
"দুই — আমরা যা করেছি। চারশো বছর ধরে তাকিয়ে আছি, আর যন্ত্র বড় হচ্ছে।"
"তিন — যেখানে থামতে হবে।" দাদা আঙুল তুললেন। "আয়াতটা টেলিস্কোপের কথা বলেনি, বিগ ব্যাং-এর কথাও বলেনি। আর বিজ্ঞানে এখনো অনেক কিছু মেলে না — ডার্ক এনার্জি কী, আমরা জানি না। তাই কেউ যদি বলে বিজ্ঞান কুরআন প্রমাণ করে দিয়েছে — সে বাড়িয়ে বলছে।"
"তাহলে আয়াতটা আমাকে কী বলছে?"
দাদা হাসলেন।
"আয়াতটা তোমাকে বলছে — তাকাও। গবেষণা করতে বারণ করছে না, উল্টো হুকুম দিচ্ছে তাকাতে।"
"তোমার পড়াশোনাটাই এই আয়াতের উত্তর, দাদুভাই।"
সেই রাতে দ্বীপে হুদহুদ বলল, "আগে শব্দ-পরীক্ষা। আজ ছয়টা।"
"سَمَاء?" — "আকাশ।"
"سَبْع?" — "সাত!"
"رَحْمَـٰن?" — "পরম দয়াময়।"
"خَلْق?" — "সৃষ্টি। خَلَقَ থেকে।"
"ثُمَّ?" — "সুম্মা, তারপর। দোয়ার শেষে বলি ছুম্মা আমীন!"
"بَصَر?" — মাহদী থেমে গেল। "...জানি না।"
"বাহ্!" হুদহুদ খুশি হয়ে লাফাল।
"জানি না বললে খুশি হচ্ছ কেন?!"
"কারণ তুমি অনুমান করোনি।" হুদহুদ ঝুঁটি ফোলাল। "بَصَر (বাসার — দৃষ্টি, দেখার ক্ষমতা)। আর আল্লাহর একটা নাম ٱلْبَصِير (আল-বাসীর — সর্বদ্রষ্টা)।"
তারপর সে আজকের আয়াত পড়ল:
ٱلَّذِى خَلَقَ سَبْعَ سَمَـٰوَٰتٍ طِبَاقًا (আল্লাযী খালাকা সাবআ সামাওয়াতিন তিবাকা — যিনি সৃষ্টি করেছেন স্তরে স্তরে সাত আসমান)
"طِبَاق (তিবাক — স্তরে স্তরে, একটার উপর আরেকটা)।"
"তারপর — مَّا تَرَىٰ فِى خَلْقِ ٱلرَّحْمَـٰنِ مِن تَفَـٰوُتٍ (মা তারা ফী খালকির রাহমানি মিন তাফাউত — রহমানের সৃষ্টিতে তুমি কোনো খুঁত দেখতে পাবে না)।"
"تَفَاوُت মানে গরমিল, অসামঞ্জস্য — এক জায়গার সাথে আরেক জায়গা না মেলা।"
মাহদী চমকে উঠল। দাদার কথাটা কানে বাজল — যত দূরেই তাকাক, নিয়ম একই, হিসাব মেলে।
"আর এবার চ্যালেঞ্জটা," হুদহুদ বলল, আর গলাটা বদলে গেল।
فَٱرْجِعِ ٱلْبَصَرَ هَلْ تَرَىٰ مِن فُطُورٍ (ফারজিইল বাসারা হাল তারা মিন ফুতূর — দৃষ্টি ফিরিয়ে আনো, কোনো ফাটল দেখতে পাও কি?)
"فُطُور (ফুতূর — ফাটল, চিড়)।"
"আর তারপর আল্লাহ আরও একবার বলছেন —"
ثُمَّ ٱرْجِعِ ٱلْبَصَرَ كَرَّتَيْنِ يَنقَلِبْ إِلَيْكَ ٱلْبَصَرُ خَاسِئًا وَهُوَ حَسِيرٌ (সুম্মারজিইল বাসারা কার্রাতাইনি ইয়ানকালিব ইলাইকাল বাসারু খাসিআও ওয়াহুওয়া হাসীর — তারপর আবার দৃষ্টি ফেরাও; দৃষ্টি ব্যর্থ ও ক্লান্ত হয়ে তোমার কাছে ফিরে আসবে)
"كَرَّتَيْنِ," হুদহুদ বলল। "মানে দুইবার। মনে আছে দুই-এর আলাদা রূপ?"
"তাসনিয়া!" মাহদী বলল।
"একদম। আর خَاسِئ মানে ব্যর্থ, হার মানা। আর حَسِير মানে ক্লান্ত, হাঁপিয়ে ওঠা।"
মাহদী আয়াতটার দিকে তাকিয়ে রইল।
"হুদহুদ, আজ দাদা টেলিস্কোপ এনেছেন। বললেন চারশো বছর ধরে মানুষ তাকিয়ে আছে।"
"আর কী পেয়েছে?"
"অনেক কিছু। কিন্তু ফাটল পায়নি।"
হুদহুদ ধীরে মাথা নাড়ল।
"তাহলে আয়াতের শব্দটা মিলিয়ে দেখো, সেনাপতি। আল্লাহ বলেননি তুমি ফাটল পাবে না। বলেছেন — দৃষ্টি ক্লান্ত হয়ে ফিরে আসবে।"
"পার্থক্যটা কী?"
"পার্থক্য হলো — আল্লাহ তোমাকে তাকাতে নিষেধ করেননি। বরং দুইবার তাকাতে বলেছেন।"
হুদহুদ ডানা মেলল।
"এই আয়াতটা গবেষণার শত্রু নয়, মাহদী। এটা গবেষণার হুকুম। আর তোমার দাদার টেলিস্কোপটা এই আয়াতেরই বাধ্য ছাত্র।" 🔭