🗺️ আজকের অভিযান
রাতে দাদির ঘর থেকে গুনগুন আওয়াজ আসছিল। মাহদী দরজায় দাঁড়াল।
দাদি জায়নামাজে বসে চোখ বন্ধ করে পড়ছেন। মাহদী কান পেতে শুনল — লম্বা সূরা, সে চেনে না।
পড়া শেষ হলে সে ভেতরে গেল। "দাদি, এটা কোন সূরা?"
"সূরা মূলক," দাদি বললেন। "আমি রোজ রাতে পড়ি। চল্লিশ বছর ধরে।"
"চল্লিশ বছর?!"
"তোমার দাদা যেদিন আমাকে শিখিয়েছিলেন, সেদিন থেকে।" দাদি তসবিহটা গুটিয়ে রাখলেন। "নবীজি (সা.) বলেছেন — কুরআনে ত্রিশ আয়াতের একটা সূরা আছে, যে সূরা তার পাঠকের জন্য সুপারিশ করতে থাকবে যতক্ষণ না তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়।"
📚 সুনানে তিরমিযী ২৮৯১, আবু দাউদ ১৪০০
"সূরাটা সুপারিশ করে?"
"করে, দাদুভাই।" দাদি হাসলেন। "যা তুমি বুকে রাখো, তা একদিন তোমার পক্ষে দাঁড়ায়।"
মাহদী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
"দাদি, প্রথম শব্দটা কী?"
"تَبَـٰرَكَ (তাবারাকা)।"
"মানে?"
"বরকতময়।" দাদি তাঁর নাতির দিকে তাকালেন। "তুমি তো এখন শব্দ শেখো, না? তাহলে বলো তো — বরকত মানে কী?"
"অনেক... বেশি হওয়া?"
"না রে।" দাদি মাথা নাড়লেন। "বরকত মানে থেকে যাওয়া। অল্প টাকায় মাস পার হয়ে গেলে ওটা বরকত। বেশি টাকা হাওয়া হয়ে গেলে ওতে বরকত নেই।"
সেই রাতে দ্বীপের ঘাটে হুদহুদ অপেক্ষা করছিল — আর তার সামনে একটা বিরাট দরজা, সোনার মতো জ্বলছে।
"চার সপ্তাহ লাগবে এই সূরাটা শেষ করতে," হুদহুদ বলল। "ত্রিশ আয়াত। সবচেয়ে লম্বা যাত্রা।"
"আগে শব্দ-পরীক্ষা?"
"আজ আছে। আর আজকের পরীক্ষাটা কঠিন — কারণ আজকের আয়াতে অর্ধেক শব্দই তুমি চেনো।"
হুদহুদ প্রথম আয়াতটা পড়ল:
تَبَـٰرَكَ ٱلَّذِى بِيَدِهِ ٱلْمُلْكُ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَىْءٍ قَدِيرٌ (তাবারাকাল্লাযী বিয়াদিহিল মুলকু ওয়াহুওয়া আলা কুল্লি শাইইন কাদীর — বরকতময় তিনি, রাজত্ব যাঁর হাতে; আর তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান)
"এবার একটা একটা করে। ٱلَّذِى?"
"আল্লাযী — যিনি। ক্লাস ৩৮।"
"يَد?"
"ইয়াদ — হাত! সূরা মাসাদে ছিল — تَبَّتْ يَدَآ أَبِى لَهَبٍ।"
"চমৎকার! كُلّ?"
"কুল্লু — প্রত্যেক, সব।"
"شَىْء?"
"শাইউন — জিনিস।"
হুদহুদ ডানা ঝাপটাল। "তাহলে عَلَىٰ كُلِّ شَىْءٍ قَدِيرٌ মানে কী দাঁড়াল?"
মাহদী শব্দগুলো জোড়া লাগাল। "সবকিছুর... উপর... কাদীর।"
"আর قَدِير মানে সর্বশক্তিমান। পরিবারটা ق د ر — মনে আছে لَيْلَةُ ٱلْقَدْرِ?"
"কদরের রাত!"
"একই পরিবার। قَدْر মানে মাপ, ক্ষমতা, নির্ধারণ।"
তারপর হুদহুদ শব্দটা দেখাল যেটা সূরার নাম — ٱلْمُلْك।
"এটা তুমি বাংলায় রোজ বলো, মাহদী। ভাবো তো।"
মাহদী কিছুক্ষণ ভাবল। "মালিক?"
"আর?"
"মালিকানা!"
"আর?"
মাহদী হেসে ফেলল। "মগের মুল্লুক!"
হুদহুদ হাসতে হাসতে ডানা ঝাপটাতে লাগল। "তিনটাই ঠিক!"
তারপর সে দ্বিতীয় আয়াতে গেল, আর সুরটা গম্ভীর হলো:
ٱلَّذِى خَلَقَ ٱلْمَوْتَ وَٱلْحَيَوٰةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا (আল্লাযী খালাকাল মাওতা ওয়াল হায়াতা লিইয়াবলুওয়াকুম আয়্যুকুম আহসানু আমালা — যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য — কে তোমাদের মধ্যে আমলে উত্তম)
"তিনটে নতুন শব্দ ঝুড়িতে ঢোকাও," হুদহুদ বলল।
"ٱلْمَوْت (আল-মাওত — মৃত্যু)। ٱلْحَيَاة (আল-হায়াত — জীবন)। আর يَبْلُو (ইয়াবলূ — পরীক্ষা করা)।"
মাহদী লিখতে লিখতে থেমে গেল।
"হুদহুদ, একটা জিনিস অদ্ভুত লাগছে। আয়াতে মৃত্যু আগে, জীবন পরে। উল্টো লেখা!"
হুদহুদ ঝুঁটি ফুলিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
"সেনাপতি, তুমি চৌদ্দশো বছর ধরে আলেমরা যে প্রশ্নটা নিয়ে ভেবেছেন, সেটাই ধরে ফেলেছ।"
মাহদীর কান লাল হয়ে গেল।
"অনেকে বলেছেন — মৃত্যু আগে বলা হয়েছে কারণ ওটাই বেশি ভাবায়। যে মৃত্যু মনে রাখে, সে জীবনটা ভালো কাটায়।"
"আর সবচেয়ে সুন্দর শব্দটা কোনটা জানো? أَحْسَنُ عَمَلًا।"
"أَحْسَن!" মাহদী চিনে ফেলল। "সূরা তীন! أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ!"
"একদম। আর عَمَل মানে আমল — তুমি বাংলাতেই বলো, নেক আমল, আমলনামা।"
হুদহুদ থেমে মাহদীর দিকে তাকাল।
"এবার সবচেয়ে জরুরি কথাটা। আল্লাহ বলেননি أَكْثَرُ عَمَلًا — কে বেশি আমল করে। বলেছেন أَحْسَنُ عَمَلًا — কে সুন্দর আমল করে।"
মাহদী স্থির হয়ে গেল।
"তার মানে... গোনা হবে না?"
"গোনা নয়, মাহদী। ওজন।" হুদহুদ নরম গলায় বলল। "মনে আছে সাব্বিরের সাথে তোমার সেই বাইশটা সূরার প্রতিযোগিতা?"
মাহদী মাথা নিচু করল।
"এই আয়াতটা সেদিনই তোমার দরকার ছিল।" 👑