🗺️ আজকের অভিযান
মাহদী আজ একটু বেশিই জানে।
মাদ্রাসায় হুজুর সূরা আলাকের কথা তুলতেই সে হাত তুলে বলে দিল — কলমের আয়াত, হেরা গুহা, ইবনে সিনার বই। হুজুর খুশি হয়ে বললেন, "মাশাআল্লাহ!"
বাড়ি ফিরে সে তাসমিয়াকে বলল, "তুই তো এসব কিছুই জানিস না।"
তারপর দাদার ঘরে গিয়ে বলল, "দাদা, আজ আমি ক্লাসে সবার চেয়ে বেশি জানতাম।"
দাদা বই থেকে চোখ তুললেন। অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বইটা বন্ধ করে বললেন, "তোমাকে একটা কথা বলি, দাদুভাই। কাউকে বলিনি এতদিন।"
মাহদী বসল।
"আমি যেদিন অধ্যাপক হলাম — সেদিন আমার বয়স আটচল্লিশ। জীবনের সবচেয়ে বড় দিন। মিষ্টি বিলিয়েছিলাম গোটা পাড়ায়।"
দাদা চশমাটা খুলে টেবিলে রাখলেন।
"তারপরের প্রায় এক বছর, মাহদী, আমি ঠিকমতো নামাজ পড়িনি।"
মাহদী চমকে উঠল। "আপনি?!"
"হ্যাঁ। আমি।" দাদার গলা শান্ত। "ইচ্ছা করে ছাড়িনি। শুধু... মনে হতো আমার তো সব হয়ে গেছে। কী দরকার?"
"কী দরকার?" মাহদী ফিসফিস করে বলল।
"হ্যাঁ। এই তিনটে শব্দই সবচেয়ে বিপজ্জনক তিনটে শব্দ।" দাদা চশমাটা আবার পরলেন। "মানুষ যখন কিছুই জানে না, তখন সে বিনয়ী থাকে। আর যখন সে কিছু জানতে শুরু করে — তখনই সবচেয়ে বড় বিপদ।"
"তারপর কী হলো দাদা?"
দাদা হাসলেন। "তারপর তোমার দাদির টাইফয়েড হলো। এক রাতে ডাক্তার বলল, বাঁচার আশা কম।"
"আমি সেই রাতে জায়নামাজে বসেছিলাম। আটচল্লিশ বছরের অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যার সব জানি — আর আমি কাঁদছিলাম বাচ্চাদের মতো।"
ঘরটা চুপ হয়ে গেল।
"তাই যখন তুমি এসে বললে তুমি সবার চেয়ে বেশি জানতে — আমার ভয় লাগল, দাদুভাই। আমি ওই রাস্তাটা চিনি।"
সেই রাতে হুদহুদ বলল, "কাল তুমি জীবনের সবচেয়ে সুন্দর আদেশটা শিখেছ — পড়ো। আজ শুনবে তার পাশেই রাখা সতর্কবার্তাটা।"
সে পঞ্চম আয়াতটা পড়ল: عَلَّمَ ٱلْإِنسَـٰنَ مَا لَمْ يَعْلَمْ (আল্লামাল ইনসানা মা লাম ইয়া'লাম — শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না)।
"ভাবো তো, মাহদী — তুমি আজ যা কিছু জানো, তার একটাও কি তুমি নিজে আবিষ্কার করেছ?"
মাহদী মাথা নাড়ল।
"না। কেউ লিখে রেখে গেছে, কেউ তোমাকে শিখিয়েছে। তোমার সব জ্ঞান ধার করা। আর যিনি প্রথম শিখিয়েছেন, তিনি আল্লাহ।"
তারপর হুদহুদের গলা বদলে গেল।
"এবার পরের আয়াতটা শোনো। এখানে হঠাৎ সুর ঘুরে যায় — كَلَّآ إِنَّ ٱلْإِنسَـٰنَ لَيَطْغَىٰ (কাল্লা ইন্নাল ইনসানা লাইয়াতগা — কখনো নয়! নিশ্চয়ই মানুষ সীমা লঙ্ঘন করে)।"
মাহদী ভুরু কুঁচকাল। "এক মিনিট। আল্লাহ তো এইমাত্র বললেন তিনি মানুষকে শিখিয়েছেন। তারপরই বলছেন মানুষ সীমা ছাড়িয়ে যায়? দুটোর সম্পর্ক কী?"
হুদহুদ ঝুঁটি ফুলাল। "এইটাই আজকের আসল প্রশ্ন, সেনাপতি। আর তুমি নিজে থেকে জিজ্ঞেস করেছ।"
"তাহলে বলো!"
"পরের আয়াতেই উত্তর — أَن رَّءَاهُ ٱسْتَغْنَىٰ (আন রাআহুসতাগনা — কারণ সে নিজেকে অমুখাপেক্ষী মনে করে)।"
"ٱسْتَغْنَىٰ," হুদহুদ শব্দটা আবার বলল। "মানে — সে ভাবে তার আর কাউকে লাগে না।"
"আর মানুষ কখন এমন ভাবে? যখন তার হাতে টাকা আসে। ক্ষমতা আসে। আর যখন জ্ঞান আসে।"
মাহদীর কান গরম হয়ে গেল।
"লক্ষ করো কী সুন্দর সাজানো, মাহদী। আল্লাহ প্রথমে বললেন পড়ো, তারপর আমি শিখিয়েছি — আর সাথে সাথেই সাবধান করলেন জ্ঞান পেয়ে ফুলে উঠো না।"
"একই সূরায়, পাশাপাশি দুই আয়াতে। যেন ওষুধ দেওয়ার সময়েই পাশে লেখা থাকে কতটুকু খেতে হবে।"
মাহদী মাটির দিকে তাকিয়ে বলল, "হুদহুদ, আজ আমি তাসমিয়াকে বলেছি ও কিছু জানে না।"
"আর তোমার দাদা কী বললেন?"
"বললেন উনি রাস্তাটা চেনেন।"
হুদহুদ ডানা ভাঁজ করল। "তোমার দাদা আজ তোমাকে যা দিয়েছেন, সেটা উপদেশ নয়, মাহদী। সেটা নিজের লজ্জা। একজন আটচল্লিশ বছরের অধ্যাপক তাঁর নয় বছরের নাতিকে নিজের সবচেয়ে খারাপ বছরটার কথা বলেছেন — শুধু যাতে তুমি ওই গর্তে না পড়ো।"
"এটা কি সহজ কাজ?"
"না," মাহদী আস্তে বলল।
"তাহলে উপহারটার দাম বুঝেছ।"
তারপর হুদহুদ শেষ আয়াতটা পড়ল: إِنَّ إِلَىٰ رَبِّكَ ٱلرُّجْعَىٰ (ইন্না ইলা রব্বিকার রুজআ — নিশ্চয়ই তোমার রবের কাছেই ফিরে যাওয়া)।
"ٱلرُّجْعَىٰ — ফিরে যাওয়া। যত বড়ই হও, যত বেশিই জানো — রাস্তার শেষটা একই জায়গায়।"
হুদহুদ মাহদীর কাঁধে বসল।
"আর মনে রেখো, ছায়াটার সাথে তোমার লড়াই হবে জ্ঞান দিয়ে। কিন্তু সেই জ্ঞান যদি তোমাকে অহংকারী বানায়, তাহলে তুমি লড়াইটা শুরুর আগেই হেরে গেছ।"
"তোমার কলমই তোমার তলোয়ার, সেনাপতি। কিন্তু তলোয়ার নিজের দিকে ঘোরাতে নেই।" ✍️