🗺️ আজকের অভিযান
রাতে আব্বুর ভিডিও কল। কিন্তু আজ পেছনে বরফ নয় — বইয়ের তাক। সারি সারি বই, ছাদ পর্যন্ত।
"আব্বু, এটা কোথায়?"
"লাইব্রেরি।" আব্বু ক্যামেরাটা ঘুরিয়ে দেখালেন। "আজ তোমাকে একটা ছবি দেখাব, মাহদী। জাদুঘরে তোলা।"
স্ক্রিনে এল একটা পুরনো বইয়ের পাতা। হলদে হয়ে যাওয়া কাগজ, ঘন আরবি লেখা, পাশে হাতে আঁকা মানুষের শরীরের ছবি।
"এই বইটার নাম আল-কানুন ফিত-তিব্ব — চিকিৎসাশাস্ত্রের নিয়ম। লিখেছেন ইবনে সিনা, প্রায় হাজার বছর আগে।"
"তো?"
"তো, ইউরোপের মেডিকেল কলেজগুলোতে এই বইটা ছয়শো বছর ধরে পড়ানো হয়েছে।" আব্বু হাসলেন। "ভাবো — একজন মুসলিম বিজ্ঞানীর বই, আর গোটা ইউরোপ সেটা পড়ে ডাক্তার হয়েছে।"
মাহদী স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
"আব্বু, ওই সময়ের মুসলিমরা এত পড়ত কেন?"
আব্বু কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, "কারণ তারা জানত তাদের ধর্মের প্রথম শব্দটা কী ছিল।"
"কী ছিল?"
"সেটা আজ রাতেই জানবে," আব্বু বললেন। "তোমার হুজুর বলেছেন এই সপ্তাহে সূরা আলাক শুরু হবে।"
সেই রাতে হুদহুদ মাহদীকে নিয়ে গেল এক পাহাড়ের গুহামুখে। ভেতরটা অন্ধকার, ঠান্ডা, আর ভীষণ চুপচাপ।
"এই জায়গাটার নাম হেরা," সে ফিসফিস করে বলল। "এখানেই সব শুরু হয়েছিল।"
মাহদী গুহার মুখে দাঁড়িয়ে নিচে তাকাল। অনেক দূরে মক্কা শহর, ছোট ছোট আলো।
"নবীজি (সা.) মাসের পর মাস এখানে একা এসে বসে থাকতেন," হুদহুদ বলল। "ভাবতেন — এই আকাশ কে বানালো? মানুষ এত অন্যায় করে কেন? আমার কী করা উচিত?"
"তিনি উত্তর পেতেন?"
"না। বছরের পর বছর, কোনো উত্তর নেই। শুধু প্রশ্ন।"
হুদহুদ থামল। গুহার ভেতরটা যেন একটু উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
"তারপর একদিন — চল্লিশ বছর বয়সে, রমজানের এক রাতে — হঠাৎ কেউ এসে দাঁড়াল সামনে।"
"জিবরীল (আ.)?"
"হ্যাঁ। তিনি নবীজিকে (সা.) জড়িয়ে ধরলেন — এত জোরে যে তাঁর দম বন্ধ হয়ে আসছিল। তারপর ছেড়ে দিয়ে বললেন একটা শব্দ।"
হুদহুদ চুপ করে গেল।
"মাত্র একটা শব্দ, মাহদী। যেটা গোটা পৃথিবীটা বদলে দিল।"
ٱقْرَأْ (ইকরা' — পড়ো!)
মাহদী হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বলল — "দাঁড়াও। প্রথম শব্দটা নামাজ পড়ো না? রোজা রাখো না? পড়ো?"
"হ্যাঁ, সেনাপতি!" হুদহুদ উত্তেজিত হয়ে ডানা ঝাপটাল। "ইসলামের প্রথম আদেশই জ্ঞান অর্জন!"
মাহদীর আব্বুর কথা মনে পড়ল। কারণ তারা জানত তাদের ধর্মের প্রথম শব্দটা কী ছিল।
"কিন্তু আয়াতটা এখানেই থামেনি," হুদহুদ বলল। "ٱقْرَأْ بِٱسْمِ رَبِّكَ ٱلَّذِى خَلَقَ (ইকরা' বিসমি রব্বিকাল্লাযী খালাক — পড়ো তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন)।"
"শুধু পড়ো নয় — রবের নামে পড়ো। জ্ঞান আর ঈমান, একই বাক্যে জোড়া। কুরআন কখনোই ওদের আলাদা করেনি, মাহদী। মানুষ করেছে।"
তারপর দ্বিতীয় আয়াত: "خَلَقَ ٱلْإِنسَـٰنَ مِنْ عَلَقٍ (খালাকাল ইনসানা মিন আলাক — সৃষ্টি করেছেন মানুষকে আলাক থেকে)।"
"আলাক কী?" মাহদী জিজ্ঞেস করল।
"এখানে সাবধান হও," হুদহুদ বলল। "তিন ভাগে শোনো — ঠিক যেভাবে তোমার দাদা শেখান।"
"এক — কুরআন যা বলেছে। আল্লাহ মানুষকে عَلَق থেকে সৃষ্টি করেছেন। শব্দটার কয়েকটা মানে হতে পারে — জমাট রক্ত, ঝুলে থাকা জিনিস, আটকে থাকা জিনিস।"
"দুই — মানুষ যা জানে। আজ ডাক্তাররা জানেন, মায়ের পেটে একদম শুরুর দিকে ভ্রূণ দেয়ালে আটকে যায়।"
"তিন — যেখানে থামতে হবে। কোন মানেটা আল্লাহ বোঝাতে চেয়েছেন, তা নিয়ে বড় বড় আলেমরাও একমত নন। তাই কেউ যদি বলে কুরআন বিজ্ঞান প্রমাণ করে দিয়েছে — তাড়াহুড়ো কোরো না।"
"তাহলে আয়াতটার আসল কথা কী?"
"আসল কথা হলো — তুমি কত তুচ্ছ জিনিস থেকে এসেছ, আর তোমার রব কত মহান। ওটুকু নিয়ে কারো দ্বিমত নেই।"
হুদহুদ শেষ দুটো আয়াতে গেল: "ٱقْرَأْ وَرَبُّكَ ٱلْأَكْرَمُ · ٱلَّذِى عَلَّمَ بِٱلْقَلَمِ (ইকরা' ওয়া রব্বুকাল আকরাম · আল্লাযী আল্লামা বিল কালাম — পড়ো, আর তোমার রব মহামহিমান্বিত, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন)।"
"قَلَم!" মাহদী চেঁচিয়ে উঠল। "বাংলাতেও তো আমরা কলমই বলি!"
"একদম একই শব্দ," হুদহুদ হাসল। "আর ভাবো — চৌদ্দশো বছর আগে, যেখানে বেশিরভাগ মানুষ লিখতেই জানত না, সেখানে আল্লাহ কলমের কথা তুললেন।"
"মনে রেখো সেনাপতি — ইসলামের বিজয় আসবে তলোয়ার দিয়ে নয়, কলম দিয়ে।" 📖