🗺️ আজকের অভিযান
রাতে বিদ্যুৎ চলে গেছে। মোমবাতির আলোয় তাসমিয়া ভাইয়ের গা ঘেঁষে বসে আছে।
"ভাইয়া, একটা প্রশ্ন করি?"
"কর।"
"আল্লাহ যদি একজনই হন — তাহলে ভয় লাগে কেন?"
মাহদী থমকে গেল। "মানে?"
"মানে ধরো, ক্লাসে যদি একটাই স্যার থাকেন আর উনি রাগী হন, তাহলে তো পালানোর জায়গা নেই। আল্লাহও তো একজন..." তাসমিয়া কাঁধ ঝাঁকাল। "তাহলে?"
মাহদী কী বলবে খুঁজে পেল না। তার নিজেরও তো এই কথাটা কখনো মাথায় আসেনি।
"দাঁড়া, দাদিকে জিজ্ঞেস করি।"
দাদি মোমবাতির পাশে বসে তসবিহ পড়ছিলেন। প্রশ্নটা শুনে তিনি তসবিহটা কোলে নামিয়ে রাখলেন।
"দিদিভাই, তুমি কালিমা জানো?"
"জানি! লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।"
"এখন আমাকে বলো — কুরআনে আল্লাহ যখন নিজের একত্বের কথা বলেন, তারপর কোন নামগুলো নেন?"
তাসমিয়া জানে না। মাহদীও না।
দাদি হাসলেন। "তোমরা রোজ পড়ো, অথচ খেয়াল করোনি। বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম — এই দুটো নাম।"
"তো?"
"তো এইটাই উত্তর, দিদিভাই।" দাদি মোমবাতিটা একটু সরালেন। "একজন রাগী মালিক হলে ভয়ের কথা। কিন্তু একজন দয়ালু মালিক হলে? তখন একজন হওয়াটাই তো সবচেয়ে বড় শান্তি।"
"কেন দাদি?"
"কারণ তখন আর কারো কাছে হাত পাততে হয় না। একটাই দরজা, আর সেই দরজাটা সবসময় খোলা।"
সেই রাতে দ্বীপে হুদহুদ একটাই আয়াত নিয়ে এল।
"আজ শুধু একটা আয়াত, মাহদী। কিন্তু এই একটা আয়াতে কালিমার পুরো কাঠামোটা আছে।"
وَإِلَـٰهُكُمْ إِلَـٰهٌ وَٰحِدٌ ۖ لَّآ إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلرَّحْمَـٰنُ ٱلرَّحِيمُ (ওয়া ইলাহুকুম ইলাহুন ওয়াহিদ · লা ইলাহা ইল্লা হুওয়ার রাহমানুর রাহীম — আর তোমাদের ইলাহ এক ইলাহ; তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই, তিনি পরম দয়াময়, অতি দয়ালু)
"لَّآ إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ," মাহদী পড়ল। "এটা তো প্রায় কালিমা!"
"প্রায় নয় — এটাই কালিমা, শুধু শেষে আল্লাহ-র জায়গায় হুওয়া (তিনি)।"
হুদহুদ বালিতে গঠনটা এঁকে দেখাল।
"মনে আছে ক্লাস ৫২-এ إِلَّا শিখেছিলে? প্রথমে لَا দিয়ে সব মুছে ফেলা, তারপর إِلَّا দিয়ে একজনকে ফিরিয়ে আনা।"
"মুছে ফেলা আগে, প্রতিষ্ঠা পরে," মাহদী বলল।
"একদম। এখন বলো, আয়াতটা শেষ হলো কী দিয়ে?"
"ٱلرَّحْمَـٰنُ ٱلرَّحِيمُ।"
"আর এখানেই আজকের আসল কথাটা।" হুদহুদ সোজা হয়ে বসল। "আল্লাহ নিজের একত্বের ঘোষণা দিয়ে তারপর কী নাম নিলেন? ٱلْقَهَّار (মহা পরাক্রমশালী)? ٱلْجَبَّار (মহা প্রতাপশালী)? সেগুলোও তো তাঁরই নাম।"
"না। তিনি নিলেন দয়ার দুইটা নাম।"
মাহদীর তাসমিয়ার প্রশ্নটা মনে পড়ল।
"হুদহুদ, আজ তাসমিয়া জিজ্ঞেস করেছে — আল্লাহ একজনই হলে ভয় লাগে কেন? পালানোর জায়গা নেই বলে।"
হুদহুদ চুপ করে রইল কিছুক্ষণ।
"তোমার বোন ছোট, কিন্তু প্রশ্নটা ছোট নয়, মাহদী। বড় বড় মানুষ এই প্রশ্নে হোঁচট খেয়েছে।"
"তাহলে উত্তরটা কী?"
"উত্তরটা আয়াতের শেষ দুই শব্দেই আছে।" হুদহুদ বলল। "একজন হওয়াটা ভয়ের, যদি তিনি নিষ্ঠুর হন। কিন্তু একজন হওয়াটা সবচেয়ে বড় স্বস্তি, যদি তিনি দয়ালু হন।"
"কেন?"
"ভাবো তো — যদি অনেক খোদা থাকত, তাহলে তোমাকে সবাইকে খুশি রাখতে হতো। একজন খুশি হলে আরেকজন রাগ করতেন। কার কাছে যাবে, কে বেশি ক্ষমতাবান — সারাজীবন এই হিসাব করতে হতো।"
মাহদী হেসে ফেলল। "মাদ্রাসায় তিনজন হুজুর তিন রকম বললে যেমন হয়!"
"একদম!" হুদহুদ লাফাল। "কিন্তু আল্লাহ একজন — মানে একটাই দরজা। আর সেই দরজার মালিক আর-রাহমান।"
সে ডানা ভাঁজ করল।
"কাল সকালে তাসমিয়াকে বলো, সেনাপতি — আপা, তোর প্রশ্নের উত্তরটা কালিমার শেষে নয়। উত্তরটা বিসমিল্লাহর শেষে।" 🕯️