🗺️ আজকের অভিযান
সেদিন রাতে অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটল।
মাহদী রোজকার মতো সূরা মূলক পড়ছিল। বাইশ সপ্তাহে এটা এখন অভ্যাস — শুয়ে পড়ার আগে ত্রিশ আয়াত।
কিন্তু আজ أَلَمْ يَأْتِكُمْ نَذِيرٌ আয়াতটায় এসে সে হঠাৎ থেমে গেল।
গলাটা ধরে এল। তারপর চোখ ভিজে গেল।
সে নিজেই অবাক। কেন কাঁদছি? কেউ তো কিছু বলেনি, কিছু হয়ওনি।
সে দ্রুত চোখ মুছে ফেলল, যেন কেউ দেখে না ফেলে।
পরদিন সকালে সে দাদার ঘরে গিয়ে ইতস্তত করে বলল, "দাদা, কাল রাতে... আমি একটা আয়াত পড়তে গিয়ে কেঁদে ফেলেছি। এটা কি খারাপ কিছু?"
দাদা বইটা নামিয়ে রাখলেন।
অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন নাতির দিকে।
"দাদুভাই," তিনি শেষে বললেন, "তুমি আমাকে আজ যা বললে, সেটা তোমার একশো ক্লাসের যেকোনো ব্যাজের চেয়ে বড়।"
"কেন দাদা?"
"কারণ আয়াত মুখস্থ হলে মাথায় ওঠে। আর আয়াত বুঝলে হৃদয়ে নামে।" দাদা চশমা মুছলেন। "কাল রাতে ওটা নেমেছে।"
মাহদী কিছু বলতে পারল না।
"কিন্তু একটা কথা মনে রেখো," দাদা যোগ করলেন। "কান্না আসে, আনা যায় না। কোনোদিন যদি ভাবো এবার একটু কেঁদে দেখাই — সেদিনই ওটা নষ্ট হয়ে যাবে।"
সেই রাতে হুদহুদ গুহার মুখে অপেক্ষা করছিল।
কিন্তু আজ সে ভেতরে নিয়ে গেল না। বরং বাইরে একটা পাথরের উপর বসাল।
"আজ ভেতরে যাব না," সে বলল। "আজ একটা আলাদা আয়াত।"
"কেন?"
"কারণ কাল রাতে তোমার কিছু একটা হয়েছে।"
মাহদী চমকে তাকাল। "তুমি জানো?"
"আমি চিঠি বয়ে বেড়াই, মনে নেই?" হুদহুদ ঝুঁটি নাড়ল — কিন্তু আজ ঠাট্টার সুরে নয়।
সে আয়াতটা পড়ল, ধীরে ধীরে:
لَوْ أَنزَلْنَا هَـٰذَا ٱلْقُرْءَانَ عَلَىٰ جَبَلٍ لَّرَأَيْتَهُۥ خَـٰشِعًا مُّتَصَدِّعًا مِّنْ خَشْيَةِ ٱللَّهِ (লাও আনযালনা হাযাল কুরআনা আলা জাবালিল লারাআইতাহু খাশিআম মুতাসাদ্দিআম মিন খাশইয়াতিল্লাহ — যদি আমরা এই কুরআন কোনো পাহাড়ের উপর নাযিল করতাম, তবে তুমি তাকে দেখতে আল্লাহর ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ)
মাহদী স্তব্ধ হয়ে গেল।
"পাহাড়?" সে ফিসফিস করে বলল।
"পাহাড়।" হুদহুদ বলল। "পৃথিবীর সবচেয়ে শক্ত, সবচেয়ে ভারী, সবচেয়ে অনড় জিনিসটা।"
"আর কী হতো?"
"দুইটা জিনিস। خَـٰشِعًا — সে নত হয়ে যেত। আর مُّتَصَدِّعًا — সে ফেটে চৌচির হয়ে যেত।"
"خَـٰشِع," মাহদী শব্দটা নেড়েচেড়ে দেখল। "খুশু!"
"হ্যাঁ। নামাজে যেটার কথা সবচেয়ে বেশি বলা হয়। নরম হয়ে যাওয়া, নত হয়ে যাওয়া।"
মাহদী পাথরের উপর বসে থাকল অনেকক্ষণ।
"হুদহুদ, তাহলে কাল রাতে যা হয়েছে..."
"তোমার চোখ ভিজে গিয়েছিল।"
"হ্যাঁ। আর আমি লজ্জা পেয়েছিলাম।"
হুদহুদ ঘুরে তাকাল।
"সেনাপতি, আয়াতটা কী বলছে ভালো করে শোনো। পাহাড় পর্যন্ত ফেটে যেত। আর তোমার শুধু চোখ ভিজেছে।"
"তাহলে লজ্জার কী আছে?"
মাহদী কিছু বলতে পারল না।
"বরং উল্টো প্রশ্নটা করো," হুদহুদ বলল। "পাহাড় ফাটে, আর মানুষের চোখ শুকনো থাকে কেন?"
সে থামল।
"এইজন্যই আয়াতটা শেষ হয়েছে ওই শব্দটা দিয়ে।"
وَتِلْكَ ٱلْأَمْثَـٰلُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ (ওয়া তিলকাল আমসালু নাদরিবুহা লিন্নাসি লাআল্লাহুম ইয়াতাফাক্কারূন — আর এসব উপমা আমরা মানুষের জন্য দিই, যাতে তারা চিন্তা করে)
"يَتَفَكَّرُونَ," হুদহুদ বলল। "বাংলায় বলো তো?"
মাহদী শব্দটা মনে মনে বলল। তারপর হেসে ফেলল।
"ফিকির! আম্মু রোজ বলেন — একটু ফিকির করে দেখো!"
"একদম সেই শব্দ।" হুদহুদ ডানা মেলল। "আর এইটাই আয়াতের আসল কাজ, মাহদী। পাহাড়ের কথাটা ভয় দেখানোর জন্য নয় — ফিকির করানোর জন্য।"
তারপর সে পরের আয়াতটা পড়ল, আর সুরটা হঠাৎ নরম হয়ে এল:
هُوَ ٱللَّهُ ٱلَّذِى لَآ إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ ۖ عَـٰلِمُ ٱلْغَيْبِ وَٱلشَّهَـٰدَةِ ۖ هُوَ ٱلرَّحْمَـٰنُ ٱلرَّحِيمُ (হুওয়াল্লাহুল্লাযী লা ইলাহা ইল্লা হুওয়া · আলিমুল গইবি ওয়াশ শাহাদাহ · হুওয়ার রাহমানুর রাহীম — তিনিই আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই; গায়েব ও প্রকাশ্যের জ্ঞানী; তিনিই রাহমান, রাহীম)
"এই আয়াতে তিনটে শব্দ আছে যা তুমি চেনো। খুঁজে বের করো।"
মাহদী পড়ল, আর একে একে ধরল:
"ٱلْغَيْب — অদৃশ্য! জিনের সূরা, ঢালের দ্বীপ!"
"ٱلشَّهَادَة — সাক্ষ্য! শাহাদাত, শহীদ!"
"আর ٱلرَّحْمَـٰنُ ٱلرَّحِيمُ — বিসমিল্লাহ!"
হুদহুদ ঝুঁটি ফোলাল।
"তিনে তিন, সেনাপতি। কিন্তু এবার আসল কথাটা ভাবো — আয়াতটা কী দিয়ে শেষ হলো?"
মাহদী শব্দ দুইটার দিকে তাকাল।
"দয়া দিয়ে।"
"পাহাড় ফেটে যাওয়ার কথা বলার ঠিক পরের আয়াতেই।" হুদহুদ নরম গলায় বলল। "তিনি কখনো ভয় দেখিয়ে ছেড়ে দেন না, মাহদী। এতদিনে তুমি সেটা জেনে গেছ।" 💧