🗺️ আজকের অভিযান
ভোরবেলা উঠানে হইচই শুনে মাহদীর ঘুম ভাঙল।
দাদি টিউবওয়েলের হাতল ধরে উপর-নিচ করছেন। খট। খট। খট।
পানি উঠছে না।
"কী হলো?"
"শুকিয়ে গেছে," দাদি হাতল ছেড়ে দিলেন। "গত সপ্তাহেও কম আসছিল।"
সকাল হতে হতে জানা গেল পুরো পাড়ার একই অবস্থা। সবাই কলসি-বালতি নিয়ে চলল তিন বাড়ি পরের গভীর নলকূপটায়।
লাইন লম্বা। মাহদী দুই বালতি নিয়ে দাঁড়াল।
দুপুরে আম্মু ফার্ম থেকে ফিরে ব্যাপারটা শুনলেন।
"এটা নতুন কিছু না, বাবা," তিনি বললেন। "সাতক্ষীরায় পানির স্তর প্রতি বছর নিচে নামছে। আর নিচে নামলে লবণ উঠে আসে।"
"লবণ কোত্থেকে আসে?"
"সমুদ্র থেকে। আমরা তো উপকূলের কাছে।" আম্মু গ্লাসে পানি ঢাললেন। "কিছু গ্রামে এখন খাওয়ার পানি কিনতে হয়।"
মাহদী গ্লাসটার দিকে তাকিয়ে রইল।
এত সাধারণ একটা জিনিস। কল ঘোরালেই আসে।
"আম্মু, পানি যদি একদম শেষ হয়ে যায়?"
আম্মু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
"তাহলে টাকা দিয়েও কিছু হবে না, বাবা। পানি বানানো যায় না। শুধু খুঁজে পাওয়া যায়।"
সেই রাতে দ্বীপে হুদহুদ অপেক্ষা করছিল — আর তার সামনে সেই সোনার দরজাটা, কিন্তু আজ অর্ধেক খোলা।
"আজ সূরা মূলকের শেষ দুই আয়াত," সে বলল। "পনেরো ক্লাস, ত্রিশ আয়াত।"
মাহদীর বুকটা ধক করে উঠল। "শেষ?"
"শেষ।"
হুদহুদ প্রথম আয়াতটা পড়ল:
قُلْ هُوَ ٱلرَّحْمَـٰنُ ءَامَنَّا بِهِۦ وَعَلَيْهِ تَوَكَّلْنَا (কুল হুওয়ার রাহমানু আমান্না বিহি ওয়া আলাইহি তাওয়াক্কালনা — বলুন: তিনিই রহমান, আমরা তাঁর উপর ঈমান এনেছি এবং তাঁরই উপর ভরসা করেছি)
"تَوَكَّلْنَا," হুদহুদ বলল। "চেনা লাগছে?"
"তাওয়াক্কুল! সবাই বলে!"
"আর পরিবারটা و ك ل। এই পরিবারের আরেকজনকে তুমি চেনো — কোর্টে যিনি তোমার হয়ে কথা বলেন?"
মাহদী ভাবল... তারপর চেঁচিয়ে উঠল। "উকিল!"
"একদম!" হুদহুদ ডানা ঝাপটাল। "وَكِيل — যাকে তুমি নিজের কাজের ভার দাও। তাহলে তাওয়াক্কুল মানে — আল্লাহকে নিজের কাজের উকিল বানানো।"
"তার মানে আমি কিছু করব না?"
"উল্টো!" হুদহুদ ঝুঁটি ফোলাল। "উকিল রাখলে কি তুমি কাগজপত্র জোগাড় করা বন্ধ করে দাও? এক লোক একবার নবীজিকে (সা.) বলেছিল সে উট না বেঁধেই তাওয়াক্কুল করেছে। তিনি বললেন — আগে উট বাঁধো, তারপর তাওয়াক্কুল করো।"
📚 সুনানে তিরমিযী ২৫১৭
তারপর হুদহুদ থামল।
"এবার শেষ আয়াত, মাহদী। ত্রিশ নম্বর।"
সে ধীরে ধীরে পড়ল:
قُلْ أَرَءَيْتُمْ إِنْ أَصْبَحَ مَآؤُكُمْ غَوْرًا فَمَن يَأْتِيكُم بِمَآءٍ مَّعِينٍ (কুল আরাআইতুম ইন আসবাহা মাউকুম গাওরান ফামাই ইয়াতীকুম বিমাইম মাঈন — বলুন: তোমরা ভেবে দেখেছ কি — যদি তোমাদের পানি ভূগর্ভে নেমে যায়, তবে কে তোমাদের এনে দেবে প্রবাহমান পানি?)
মাহদী স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
"হুদহুদ..." তার গলা কেঁপে গেল। "আজ সকালে আমাদের টিউবওয়েলে পানি ওঠেনি।"
হুদহুদ ঘুরে তাকাল।
"পুরো পাড়ার। সবাই লাইন দিয়ে অন্য জায়গা থেকে এনেছে। আম্মু বলেছেন সাতক্ষীরায় পানির স্তর রোজ নিচে নামছে।"
হুদহুদ অনেকক্ষণ কিছু বলল না।
"غَوْرًا," সে শেষে বলল। "শব্দটার মানে জানো? নিচে নেমে যাওয়া, নাগালের বাইরে চলে যাওয়া।"
"আর مَّعِين মানে প্রবাহমান, চোখের সামনে বয়ে যাওয়া পানি।"
মাহদী গলা শুকিয়ে যাওয়া অনুভব করল।
"সেনাপতি," হুদহুদ বলল, "আল্লাহ এই সূরাটা শেষ করলেন সবচেয়ে সাধারণ জিনিসটা দিয়ে। আকাশ নয়, ফেরেশতা নয়, জাহান্নাম নয়।"
"এক গ্লাস পানি।"
"কেন?"
"কারণ সবচেয়ে বড় নিয়ামতগুলো সবচেয়ে চুপচাপ থাকে, মাহদী। যতক্ষণ আছে, কেউ খেয়ালই করে না।"
সে ডানা মেলল।
"তোমার আম্মু আজ কী বলেছেন?"
"বলেছেন পানি বানানো যায় না। শুধু খুঁজে পাওয়া যায়।"
হুদহুদ ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
"তাহলে আয়াতটা তোমার বাড়ির উঠানেই নাযিল হয়েছে আজ।"
আর ঠিক তখনই — সোনার দরজাটা পুরোপুরি খুলে গেল।
হুদহুদ ঘুরে দাঁড়াল, আর তার চোখ চকচক করছে।
"সূরা মূলক শেষ, মাহদী বিন মামুন। ত্রিশ আয়াত।"
"পনেরো সপ্তাহ আগে তুমি ভয় পেয়েছিলে এত লম্বা সূরা দেখে। মনে আছে?"
মাহদী মাথা নাড়ল।
"আর এখন?"
মাহদী দরজাটার দিকে তাকাল। ওপাশে আলো।
"এখন..." সে বলল, "এখন আমি আরেকটা চাই।" 💧