🗺️ আজকের অভিযান
নানার আড়তে আজ দুর্ঘটনা।
গুদামের কাঠের সিঁড়িটার তিন নম্বর ধাপ ভাঙা ছিল। নানা এক সপ্তাহ আগে সেখানে লাল কালিতে লিখে রেখেছিলেন — "সাবধান! ভাঙা।" আর পাশে একটা বাঁশ আড়াআড়ি বেঁধে দিয়েছিলেন।
আজ দুপুরে নতুন এক কর্মচারী তাড়াহুড়ো করে বাঁশটা সরিয়ে উঠতে গেলেন। ধাপটা ভেঙে গেল, উনি পড়ে গিয়ে পা মচকালেন।
মাহদী দৌড়ে গেল। নানাও এলেন।
লোকটা ব্যথায় কোঁকাচ্ছেন আর বারবার বলছেন, "আমি জানতাম না! কেউ বলেনি!"
নানা কিছু বললেন না। শুধু হাত ধরে তুললেন, বসালেন, পানি দিলেন।
পরে মাহদী জিজ্ঞেস করল, "নানা, লেখা তো ছিল। আপনি বললেন না কেন?"
নানা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
"লোকটার পা ব্যথা করছিল, দাদুভাই। ওই সময় আমি বলেছিলাম কথাটার কোনো দাম নেই।"
তারপর তিনি যোগ করলেন, "কিন্তু একটা জিনিস মনে রাখো — সতর্কবার্তা যে দেয়, সে শত্রু নয়। ওই বাঁশটা আমি ওখানে বাঁধিনি ওকে আটকাতে। বেঁধেছিলাম ওকে বাঁচাতে।"
সন্ধ্যায় মাহদী নিজে গিয়ে বাঁশটা আবার বাঁধল। আর লাল কালির লেখাটা মোটা করে লিখে দিল।
সেই রাতে হুদহুদের গলা আলাদা শোনাল।
"আজকের আয়াত কঠিন, মাহদী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত থেকো — কারণ দরজাটা খোলাই থাকবে।"
তারা হাঁটতে হাঁটতে এমন এক জায়গায় পৌঁছাল যেখানে বাতাস গরম। দূরে একটা বিশাল ফটক, আর তার ওপাশ থেকে আসছে অদ্ভুত এক আওয়াজ।
গর্জন নয়। হাঁপানোর শব্দ — যেন কোনো বিরাট প্রাণী নিঃশ্বাস টানছে।
মাহদী থমকে দাঁড়াল।
إِذَآ أُلْقُوا۟ فِيهَا سَمِعُوا۟ لَهَا شَهِيقًا وَهِىَ تَفُورُ (ইযা উলকূ ফীহা সামিঊ লাহা শাহীকাও ওয়া হিয়া তাফূর — যখন তাদের সেখানে নিক্ষেপ করা হবে, তখন তারা শুনবে তার বিকট শব্দ, আর তা ফুটতে থাকবে)
"شَهِيق (শাহীক) মানে নিঃশ্বাস টানার শব্দ — গাধার ডাকের প্রথম অংশটার মতো," হুদহুদ বলল। "আর تَفُورُ (তাফূরু) মানে ফুটতে থাকা, যেমন হাঁড়ির পানি টগবগ করে।"
"তারপর?" মাহদীর গলা কাঁপল।
تَكَادُ تَمَيَّزُ مِنَ ٱلْغَيْظِ (তাকাদু তামায়্যাযু মিনাল গইয — রোষে যেন তা ফেটে পড়বে)
"غَيْظ (গইয) মানে চাপা রাগ — যে রাগ ভেতরে ফুলে ওঠে।"
মাহদী পিছিয়ে গেল এক পা।
"এবার দেখো," হুদহুদ ফিসফিস করে বলল। "একটা দল আসছে।"
ফটকের সামনে দাঁড়াল একদল মানুষ। আর ফটকের দুই পাশে দাঁড়ানো লম্বা লম্বা অবয়ব — রক্ষীরা।
তারা কোনো ধমক দিল না, চিৎকারও করল না।
শুধু একটা প্রশ্ন করল।
أَلَمْ يَأْتِكُمْ نَذِيرٌ (আলাম ইয়াতিকুম নাযীর — তোমাদের কাছে কি কোনো সতর্ককারী আসেনি?)
মাহদী স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
সে ভেবেছিল কঠিন কিছু জিজ্ঞেস করা হবে — নামাজ কয়টা পড়েছ, কত টাকা দান করেছ। কিন্তু প্রশ্নটা এত... সহজ।
"হুদহুদ, ওরা শুধু এইটুকু জিজ্ঞেস করছে?"
"শুধু এইটুকু।" হুদহুদ বলল। "خَزَنَة (খাযানাহ — রক্ষীরা)। শব্দটা চেনা লাগছে?"
মাহদী মাথা নাড়ল।
"বাংলায় যে টাকার হিসাব রাখে, তাকে কী বলে?"
"খাজাঞ্চি!"
"সেই একই শব্দ, একই পরিবার — خ ز ن, ভাণ্ডার পাহারা দেওয়া।"
তারপর হুদহুদ মাহদীর দিকে ফিরল, আর গলাটা নরম হয়ে এল।
"এখন বলো — نَذِير মানে কী?"
"সতর্ককারী।"
"আর আজ দুপুরে তোমার নানার আড়তে নাযীর কে ছিল?"
মাহদী থেমে গেল।
"...লাল কালির লেখাটা। আর বাঁশটা।"
"আর লোকটা কী বলেছিলেন?"
"আমি জানতাম না। কেউ বলেনি।"
হুদহুদ ধীরে মাথা নাড়ল। "আর কাল ওই ফটকেও ঠিক এই কথাটাই বলার চেষ্টা করবে অনেকে।"
দুজনে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
"হুদহুদ, তুমি বলেছিলে দরজাটা খোলা থাকবে।"
"থাকবে।" হুদহুদ ঘুরে দাঁড়াল, আর ফটকের উল্টো দিকে ইশারা করল।
সেদিকে অন্ধকারে একটা সরু আলো — একটা পথ, নিচের দিকে নেমে গেছে।
"ওটা কোথায় যায়?"
"ওটাই আজকের সবচেয়ে জরুরি কথা, সেনাপতি," হুদহুদ বলল। "যতক্ষণ তুমি প্রশ্নটা শুনতে পাচ্ছ, ততক্ষণ তুমি ফটকের ওপাশে নও — এপাশে।"
"মানে এখনো সময় আছে।"
"এখনো সময় আছে।" হুদহুদ ডানা মেলল। "আর এই একটা কথা জানার জন্যই আয়াতটা নাযিল হয়েছে — ভয় দেখাতে নয়।" 🔥