🗺️ আজকের অভিযান
রাতে ছাদে মাদুর পাতা হয়েছে। দাদা, মাহদী, তাসমিয়া — তিনজনে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে।
"দাদা বলেছেন আজ রাতে অনেক তারা খসবে," তাসমিয়া ফিসফিস করল।
আর সত্যিই — হঠাৎ একটা আলোর রেখা আকাশ চিরে নেমে গেল।
"ওই যে!" তাসমিয়া লাফিয়ে উঠল। "দোয়া করো ভাইয়া! তারা খসলে দোয়া কবুল হয়!"
দাদা মাথা ঘোরালেন।
"কে বলেছে দিদিভাই?"
"সবাই বলে।"
"হুম।" দাদা আবার আকাশের দিকে তাকালেন। "দোয়া করো, দিদিভাই — কিন্তু তারা খসেছে বলে নয়। দোয়া তো যেকোনো সময়ই করা যায়। তারা খসলে দোয়া কবুল হয়, এমন কথা কুরআনেও নেই, হাদিসেও নেই।"
"তাহলে সবাই বলে কেন?"
"মানুষ অনেক কিছু বলে," দাদা শান্তভাবে বললেন। "আর আমরা শুনে শুনে ভাবি এটা বুঝি দ্বীনের কথা। তাই সবসময় জিজ্ঞেস করবে — কোন আয়াতে? কোন হাদিসে?"
মাহদীর গায়ে কাঁটা দিল। কালই আম্মু ঠিক এই কথাটা বলেছেন।
"দাদা, তাহলে তারা খসে কেন?"
"ওগুলো আসলে তারা নয়, দাদুভাই। তারারা তো সূর্যের মতো — বিশাল, দূরে। ওগুলো উল্কা — মহাকাশের ছোট ছোট পাথর আর ধুলোর টুকরো। পৃথিবীর বাতাসে ঢোকার সময় ঘষা খেয়ে জ্বলে ওঠে।"
"তাহলে কুরআনে যে শিহাব-এর কথা আছে?"
দাদা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
"এইখানে খুব সাবধান হতে হবে। তিন ভাগে শোনো, আর তিন নম্বরটা আজ সবচেয়ে জরুরি।"
"এক — কুরআন যা বলেছে। শয়তানরা উপরের জগতের খবর শুনতে চায়, আর তাদের শিহাব দিয়ে তাড়ানো হয়।"
"দুই — বিজ্ঞান যা বলে। আমরা যে আলোর রেখা দেখি, সেটা উল্কার পোড়া। এটা মাপা যায়, হিসাব করা যায়।"
"তিন — যেখানে কেউ নিশ্চিত নয়।" দাদা উঠে বসলেন। "আয়াতের শিহাব আর আমাদের দেখা উল্কা — একই জিনিস কি না, তা নিয়ে আলেমদের মধ্যেই ভিন্ন মত আছে। কেউ বলেন এক, কেউ বলেন আলাদা।"
"তাহলে কোনটা ঠিক?"
"আমরা জানি না।" দাদা হাসলেন। "আর জানি না বলাটা এখানে সবচেয়ে সৎ উত্তর। কুরআন উল্কাপাতের বিজ্ঞান শেখাতে আসেনি, দাদুভাই। এসেছে অন্য কিছু শেখাতে।"
"কী শেখাতে?"
"সেটা তুমি আজ রাতেই জানবে।"
সেই রাতে দ্বীপের আকাশে মাহদী দেখল — উঁচুতে, অনেক উঁচুতে, আলোর একটা সীমানা। যেন কোনো দেয়াল, কিন্তু আলোর।
আর নিচে, অন্ধকারের ভেতর, কী যেন নড়ছে। ছায়ার মতো। উপরে ওঠার চেষ্টা করছে।
"ওরা কারা?" মাহদী ফিসফিস করল।
"শোনো," হুদহুদ বলল, আর পড়ল:
لَّا يَسَّمَّعُونَ إِلَى ٱلْمَلَإِ ٱلْأَعْلَىٰ وَيُقْذَفُونَ مِن كُلِّ جَانِبٍ (লা ইয়াস্সাম্মাঊনা ইলাল মালাইল আ'লা ওয়া ইউকযাফূনা মিন কুল্লি জানিব — তারা ঊর্ধ্বজগতের কিছু শুনতে পারে না, আর তাদের প্রতি সব দিক থেকে নিক্ষেপ করা হয়)
"ٱلْمَلَإِ ٱلْأَعْلَىٰ — ঊর্ধ্বতন মজলিস। যেখানে ফেরেশতারা আল্লাহর হুকুম নিয়ে কথা বলেন।"
"আর ওই ছায়াগুলো?"
"শয়তানরা। ওরা কান পাততে চায় — একটা শব্দ, একটা টুকরো খবর যদি ধরা যায়।"
"ধরলে কী করবে?"
"নিচে নিয়ে এসে মানুষের কানে ঢালবে। আর মানুষ ভাববে সে গায়েবের খবর পেয়ে গেছে।"
মাহদী সোজা হয়ে দাঁড়াল। "গণক! জ্যোতিষী!"
"বাহ্!" হুদহুদ ডানা ঝাপটাল। "এইটাই আয়াতের আসল কথা, সেনাপতি। এই আয়াতগুলো উল্কাপাত শেখাতে আসেনি — এসেছে বলতে যে গায়েবের খবর কেউ চুরি করতে পারে না।"
তারপর সে পরের আয়াতটা পড়ল:
إِلَّا مَنْ خَطِفَ ٱلْخَطْفَةَ فَأَتْبَعَهُۥ شِهَابٌ ثَاقِبٌ (ইল্লা মান খাতিফাল খাতফাতা ফাআতবাআহু শিহাবুন সাকিব — তবে কেউ ছোঁ মেরে কিছু নিয়ে গেলে জ্বলন্ত শিখা তার পিছু নেয়)
আর ঠিক তখনই — একটা ছায়া উপরে লাফাল, আর সাথে সাথে আলোর একটা তির নেমে এসে তার পিছু নিল।
মাহদী চমকে পিছিয়ে গেল।
"خَطْفَة মানে ছোঁ মারা," হুদহুদ বলল। "চিলের মতো — এক ঝটকায় ছিনিয়ে নেওয়া। ওরা পুরো কথা শুনতে পায় না, বড়জোর একটা টুকরো।"
"তারপর?"
"তারপর সেই এক টুকরোর সাথে নিরানব্বইটা মিথ্যা মিশিয়ে গণকের কানে দেয়। গণক একটা কথা মিলে গেলে বলে — দেখলে, আমি বলেছিলাম! আর বাকি নিরানব্বইটা কেউ গুনে দেখে না।"
মাহদী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
"হুদহুদ, দাদা বলেছেন আমরা যে তারা খসা দেখি, ওগুলো উল্কা।"
"তোমার দাদা ঠিক বলেছেন — যেটুকু তিনি জানেন, ততটুকুই বলেছেন।" হুদহুদ বলল। "আর তুমিও ততটুকুই বোলো, সেনাপতি। *এই আয়াত পড়ে যেন কেউ না বলে কুরআন উল্কার কথা বলেছে — আর কেউ যেন না বলে তারা খসা মানেই শয়তান তাড়ানো।*"
"তাহলে আমি কী বলব?"
"বলবে যা আয়াত বলেছে। আকাশ পাহারা দেওয়া আছে। গায়েবের খবর চুরি হয় না। আর যে বলে সে ভবিষ্যৎ জানে — সে হয় ঠকছে, নয় ঠকাচ্ছে।"
তারপর হুদহুদ শেষ আয়াতটা পড়ল, আর সুরটা হঠাৎ নরম হয়ে এল:
فَٱسْتَفْتِهِمْ أَهُمْ أَشَدُّ خَلْقًا أَم مَّنْ خَلَقْنَآ ۚ إِنَّا خَلَقْنَـٰهُم مِّن طِينٍ لَّازِبٍ (ফাসতাফতিহিম আহুম আশাদ্দু খালকান আম মান খালাকনা · ইন্না খালাকনাহুম মিন তীনিল লাযিব — তাদের জিজ্ঞেস করুন: তারা সৃষ্টিতে কঠিনতর, না আমরা যা সৃষ্টি করেছি তা? আমরা তো তাদের সৃষ্টি করেছি আঠালো মাটি থেকে)
"طِينٍ لَّازِبٍ — আঠালো কাদা," হুদহুদ বলল।
"এইমাত্র আমরা আকাশের সারি দেখলাম, উল্কা দেখলাম, ঊর্ধ্বজগতের মজলিসের কথা শুনলাম। আর তারপর আল্লাহ মনে করিয়ে দিলেন — তুমি কাদা থেকে বানানো।"
সে মাহদীর দিকে তাকাল।
"যে ছেলেটা আকাশের সারি দেখে ফেলেছে, তার একটু মনে করিয়ে দেওয়া দরকার সে কোথা থেকে এসেছে।" 🌠