🗺️ আজকের অভিযান
নানা আজ মাহদীকে নিয়ে গেছেন এমন এক জায়গায় যেটা মাহদী আগে কখনো দেখেনি।
দিগন্ত পর্যন্ত শুধু পানি — কিন্তু পুকুর নয়, নদীও নয়। চৌকো চৌকো ঘের, মাঝে মাঝে বাঁধ।
"এগুলো চিংড়ির ঘের," নানা বললেন।
"সুন্দর তো!"
নানা কিছু বললেন না। হাঁটতে হাঁটতে একটা বাঁধের উপর উঠে দাঁড়ালেন।
"এই জায়গাটা আমার ছোটবেলায় কী ছিল জানো?"
"কী?"
"ধানক্ষেত। যতদূর চোখ যেত, সবুজ। বছরে দুইবার ফসল হতো।"
মাহদী চারদিকে তাকাল। একটাও গাছ নেই।
"তাহলে?"
"লবণ পানি ঢোকানো হয়েছে, দাদুভাই। চিংড়িতে লাভ বেশি।" নানা মাটিতে হাত দিয়ে এক চিমটি মাটি তুলে জিভে ঠেকালেন। "এখন এই মাটিতে ধান তো দূরের কথা, ঘাসও হয় না।"
"আবার ঠিক করা যায় না?"
"যায়। কিন্তু বহু বছর লাগে। নষ্ট করতে এক মৌসুম, ঠিক করতে এক প্রজন্ম।"
ফেরার পথে নানা থামলেন একটা জায়গায়, যেখানে বাঁধের পাশে কয়েকটা কেওড়া গাছের চারা লাগানো।
"এগুলো কে লাগিয়েছে?"
"আমি," নানা বললেন। "গত বছর। বারোটা লাগিয়েছিলাম, সাতটা বেঁচেছে।"
"এগুলো বড় হতে কতদিন লাগবে?"
নানা হাসলেন। "আমি দেখে যেতে পারব না, দাদুভাই। তুমি দেখবে।"
সেই রাতে জাহাজ থামল শেষ দ্বীপে।
আর মাহদী পা রেখেই বুঝল — এই দ্বীপ আগের পাঁচটার মতো নয়।
কোনো সোনার দরজা নেই। কোনো আলোর সিঁড়ি নেই। শুধু পাথর। ধূসর, রুক্ষ, বাতাসে ঠান্ডা।
আর দূরে, পাহাড়ের গায়ে — সেই গুহামুখ। কালো, নিঃশব্দ।
"গুহার দ্বীপ," হুদহুদ বলল। "শেষ দ্বীপ।"
মাহদী গুহাটার দিকে তাকিয়ে রইল। বুকটা ধুকপুক করছে।
"আজই যাব?"
"না।" হুদহুদ মাথা নাড়ল। "চার সপ্তাহ আছে। আর আজ আমরা যাব অন্য দিকে।"
সে মাহদীকে নিয়ে গেল দ্বীপের উল্টো পাশে — আর সেখানে দৃশ্যটা দেখে মাহদী থমকে গেল।
অর্ধেক জমি সবুজ, ফসলে ভরা। আর অর্ধেক মরা — ফাটা, ধূসর, নিষ্প্রাণ।
ঠিক মাঝখানে একটা সরু রেখা।
"এটা কী?"
"আজকের আয়াত," হুদহুদ বলল।
وَلَا تُفْسِدُوا۟ فِى ٱلْأَرْضِ بَعْدَ إِصْلَـٰحِهَا (ওয়ালা তুফসিদূ ফিল আরদি বা'দা ইসলাহিহা — আর তোমরা যমীনে বিপর্যয় সৃষ্টি কোরো না, তা ঠিকঠাক করার পর)
"تُفْسِدُوا۟ — বাংলায় বলো?"
"ফাসাদ!"
"আর إِصْلَاح?"
"ইসলাহ! হুজুর বলেন!"
"একদম, সেনাপতি।" হুদহুদ ঝুঁটি ফোলাল। "আর খেয়াল করো শব্দটা — بَعْدَ إِصْلَـٰحِهَا, ঠিকঠাক করার পর।"
"মানে?"
"মানে যমীনটা আগেই ঠিক করা ছিল। আল্লাহ সাজিয়ে দিয়েছিলেন — মাটি, পানি, বাতাস, ঋতু, সব হিসাব মিলিয়ে।"
"তারপর মানুষ এল, আর ভাঙতে শুরু করল।"
মাহদীর আজ বিকেলের কথা মনে পড়ল। এখন এই মাটিতে ঘাসও হয় না।
"হুদহুদ, নানা আজ আমাকে একটা জায়গা দেখিয়েছেন। আগে ধানক্ষেত ছিল, এখন লবণ পানি।"
"তোমার নানা কী বললেন?"
"বললেন — নষ্ট করতে এক মৌসুম, ঠিক করতে এক প্রজন্ম।"
হুদহুদ অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
"এইটাই ফাসাদের স্বভাব, মাহদী। ভাঙা সহজ, গড়া কঠিন। এক ধাক্কায় গ্লাস ভাঙে; জোড়া লাগাতে সারাদিন।"
তারপর সে আয়াতের পরের অংশটা পড়ল — আর সুরটা নরম হয়ে এল।
وَٱدْعُوهُ خَوْفًا وَطَمَعًا (ওয়াদঊহু খাওফাও ওয়া তামাআ — আর তাঁকে ডাকো ভয় ও আশা নিয়ে)
"خَوْف মানে ভয়। আর طَمَع মানে আশা।"
মাহদী চমকে উঠল। "হুদহুদ! এটা তো তুমি ক্লাস ৩০-এ বলেছিলে!"
"বলো তো কী বলেছিলাম।"
মাহদী হাসল। "দুই ডানা থাকলেই পাখি ওড়ে।"
হুদহুদ ডানা দুটো মেলে ধরল — একটা এদিকে, একটা ওদিকে।
"সত্তর ক্লাস পরে সেই কথাটা কুরআনের শব্দে ফিরে এল, সেনাপতি।"
তারপর সে শেষ অংশটা পড়ল:
إِنَّ رَحْمَتَ ٱللَّهِ قَرِيبٌ مِّنَ ٱلْمُحْسِنِينَ (ইন্না রহমাতাল্লাহি কারীবুম মিনাল মুহসিনীন — নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত মুহসিনদের খুব কাছে)
"مُحْسِن মানে কে জানো?"
মাহদী ভাবল। "أَحْسَن থেকে? যে সবচেয়ে সুন্দর করে করে?"
"একদম। মুহসিন মানে — যে কাজটা শুধু করে না, সুন্দর করে করে।"
হুদহুদ দূরে তাকাল — যেখানে সবুজ আর মরা জমি মুখোমুখি।
"আর মুহসিন কে হয় বলো তো? যে গাছটা লাগায় জেনেও যে সে ফল খেয়ে যেতে পারবে না।"
মাহদীর নানার সাতটা কেওড়া চারার কথা মনে পড়ল।
আমি দেখে যেতে পারব না, দাদুভাই। তুমি দেখবে। 🌱