🗺️ আজকের অভিযান
মাহদীর টিনের কৌটায় জমানো ছিল তিনশো বিশ টাকা। ছয় মাসের জমানো। লক্ষ্য একটা ক্রিকেট ব্যাট।
আজ মাদ্রাসায় হুজুর বললেন, রহিম চাচার ছেলেটার — সেই এতিম ছেলেটার — বইখাতা কেনা হয়নি। কেউ সাহায্য করতে চাইলে করতে পারে।
মাহদী সারাদিন হিসাব করল। বই-খাতায় লাগবে দুইশো টাকার মতো। তার আছে তিনশো বিশ। কিন্তু ব্যাট লাগবে সাতশো।
দুইশো দিয়ে দিলে ব্যাটটা আরও ছয় মাস পিছিয়ে যাবে।
সেই দুইটা গলা আবার শুরু হলো।
বিকেলে সে কৌটা নিয়ে আম্মুর কাছে গেল। "আম্মু, এটা হুজুরকে দিয়ে দেব?"
আম্মু কৌটাটা হাতে নিলেন। ওজন করলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, "কষ্ট হচ্ছে?"
"হ্যাঁ।"
"তাহলে এটাই আসল দান।" আম্মু কৌটাটা ফিরিয়ে দিলেন। "যা দিলে কষ্ট হয় না, সেটা ফেলে দেওয়া। যা দিলে বুকে টান পড়ে, সেটাই দেওয়া।"
পরদিন মাহদী দুইশো টাকা হুজুরের হাতে দিল। নাম বলল না।
আর তিন দিন পরে — নানা এসে বললেন, "দাদুভাই, আড়তের হিসাব লিখতে একজন লাগবে। বিকেলে দুই ঘণ্টা। মাসে পাঁচশো টাকা দেব। পারবে?"
মাহদী নানার দিকে তাকিয়ে রইল।
"কী হলো?"
"না... কিছু না," মাহদী বলল। কিন্তু বুকের ভেতর কী যেন ধক করে উঠল।
সেই রাতে হুদহুদ বলল, "কাল প্রথম দলের কথা শুরু করেছিলাম। আজ পুরোটা শোনো।"
وَصَدَّقَ بِٱلْحُسْنَىٰ · فَسَنُيَسِّرُهُۥ لِلْيُسْرَىٰ (ওয়া সাদ্দাকা বিল হুসনা · ফাসানুয়াস্সিরুহু লিলইউসরা — আর যা উত্তম তা সত্য বলে মেনে নিল; আমরা তার জন্য সহজ পথ সুগম করে দেব)
"يُسْرَىٰ!" মাহদী চেঁচিয়ে উঠল। "এটা তো সূরা শারহের শব্দ! ইন্না মাআল উসরি ইউসরা!"
"একদম!" হুদহুদ খুশি হয়ে লাফাল। "তুমি চেনা শব্দ ধরতে শিখে গেছ, সেনাপতি। يُسْر মানে সহজতা, عُسْر মানে কঠিনতা।"
"তাহলে আয়াতটা বলছে..."
"বলছে — যে দেয়, যে তাকওয়া রাখে, যে ভালোটাকে সত্যি বলে মানে — আল্লাহ তার জীবনের রাস্তাটা সহজ করে দেন।"
মাহদী চুপ করে গেল। নানার আজকের প্রস্তাবটা মনে পড়ল।
"হুদহুদ... আমি তিন দিন আগে দুইশো টাকা দিয়েছিলাম। আজ নানা আমাকে মাসে পাঁচশো টাকার একটা কাজ দিলেন।"
হুদহুদ মাথা কাত করল। "তুমি কী ভাবছ?"
"ভাবছি এটা কি ওই কারণেই?"
"খুব সাবধানে শোনো, মাহদী।" হুদহুদ সোজা হয়ে বসল। "আমি বলতে পারি না তোমার নানার মাথায় কী ছিল। কেউ পারে না। আল্লাহ কোন দান দিয়ে কী দেন, সেটা তাঁর হিসাব — আমাদের নয়।"
"তাহলে?"
"তাহলে ভুল কাজটা হলো দান করে বসে থেকে হিসাব করা — কই, আমার লাভটা কই? ওটা দান নয়, ওটা ব্যবসা।"
"আর ঠিক কাজটা?"
"ঠিক কাজটা হলো দিয়ে ভুলে যাওয়া। তারপর যখন ভালো কিছু আসে, শুধু বলা — আলহামদুলিল্লাহ, আমার রব উদার।"
মাহদী মাথা নাড়ল।
"এবার দ্বিতীয় দলটা শোনো," হুদহুদ বলল। আর গলাটা বদলে গেল।
وَأَمَّا مَنۢ بَخِلَ وَٱسْتَغْنَىٰ · وَكَذَّبَ بِٱلْحُسْنَىٰ · فَسَنُيَسِّرُهُۥ لِلْعُسْرَىٰ (ওয়া আম্মা মাম বাখিলা ওয়াসতাগনা · ওয়া কায্যাবা বিল হুসনা · ফাসানুয়াস্সিরুহু লিলউসরা — আর যে কার্পণ্য করল এবং নিজেকে অমুখাপেক্ষী মনে করল, আর ভালোটাকে মিথ্যা বলল — আমরা তার জন্য কঠিন পথ সুগম করে দেব)
মাহদী দুটো শব্দ একসাথে চিনে ফেলল।
"ٱسْتَغْنَىٰ! সূরা আলাকে ছিল! আর كَذَّبَ..."
"...ওটাও আবার এল," হুদহুদ শান্তভাবে বলল। "খেয়াল করেছ মাহদী? যেখানেই পতন, সেখানেই এই দুইটা শব্দ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে — নিজেকে বড় ভাবা আর সত্যকে মিথ্যা বলা।"
"এই দুইটাই তো..."
"হ্যাঁ। এই দুইটাই দাজ্জালের পরিচয়। সে বলবে আমার কাউকে লাগে না, আমিই সব — এটাই ইসতিগনা। আর সে সত্যকে মিথ্যা দেখাবে — এটাই তাকযীব।"
হুদহুদ ডানা ভাঁজ করল।
"সে বাইরে থেকে আসবে, সেনাপতি। কিন্তু তার দুইটা অস্ত্রই ইতিমধ্যে প্রত্যেক মানুষের ভেতরে বসানো আছে।"
মাহদীর গা শিরশির করে উঠল।
"তাহলে বাঁচব কীভাবে?"
"সূরাটা তো উত্তরটাই দিয়ে দিল," হুদহুদ বলল। "أَعْطَىٰ — দাও। যে দিতে জানে, সে কখনো আমার কাউকে লাগে না বলতে পারে না। দান হলো অহংকারের ওষুধ।"
তারপর সে শেষ আয়াতটা পড়ল:
وَمَا يُغْنِى عَنْهُ مَالُهُۥٓ إِذَا تَرَدَّىٰ (ওয়া মা ইউগনী আনহু মালুহু ইযা তারাদ্দা — আর তার সম্পদ তার কোনো কাজে আসবে না, যখন সে ধ্বংস হবে)
"শব্দটা চেনা লাগছে?" হুদহুদ জিজ্ঞেস করল।
মাহদী কয়েক সেকেন্ড ভাবল। তারপর চোখ বড় হয়ে গেল।
"সূরা মাসাদ! مَآ أَغْنَىٰ عَنْهُ مَالُهُۥ — আবু লাহাবের সম্পদ তার কাজে আসেনি!"
"শাবাশ, সেনাপতি।" হুদহুদ ঝুঁটি ফোলাল। "একই কথা, দুই সূরায়। কুরআন তোমাকে বারবার একই জিনিস দেখাচ্ছে — যাতে ভুলে না যাও।" 💛