🗺️ আজকের অভিযান
রাতে আম্মুর ফোনে একটা ভিডিও এল। কে যেন পাঠিয়েছে।
ভিডিওতে পরিচিত এক মানুষ — এলাকার সবাই তাঁকে চেনে — এমন একটা কথা বলছেন যা শুনে আম্মুর মুখ শক্ত হয়ে গেল।
"উনি এটা বলেছেন?!" মাহদী পাশ থেকে দেখে ফেলল।
আম্মু কিছু বললেন না। ভিডিওটা আবার চালালেন। তারপর আবার। থামিয়ে, বাড়িয়ে, ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে।
তারপর ফোনটা নামিয়ে বললেন, "এটা মিথ্যা।"
"কিন্তু আম্মু, আমি নিজের চোখে দেখলাম! উনি নিজেই তো বলছেন!"
আম্মু মাহদীকে পাশে বসালেন।
"বাবা, আজ কম্পিউটার দিয়ে যেকোনো মানুষের মুখ বানানো যায়। তাঁর গলা নকল করা যায়। তিনি কোনোদিন যা বলেননি, তা তাঁর মুখ দিয়ে বলিয়ে দেওয়া যায়। এটার একটা নাম আছে — ডিপফেক।"
"তাহলে আসল-নকল বুঝব কীভাবে?"
"চোখ দিয়ে না।" আম্মু ফোনটা টেবিলে রাখলেন। "চোখ এখন আর সাক্ষী নয়, বাবা। যাচাই করতে হয়। খোঁজ নিতে হয়। জানতে হয় কে পাঠিয়েছে, কেন পাঠিয়েছে।"
তিনি মাহদীর দিকে তাকালেন।
"এই ভিডিওটা আমি কাউকে ফরওয়ার্ড করলে কী হতো?"
"সবাই বিশ্বাস করত।"
"আর ওই মানুষটার কী হতো?"
মাহদী উত্তর দিতে পারল না।
সেই রাতে গুহার বাইরে হুদহুদ পাথরের উপর বসে ছিল। মাহদী এসে পাশে বসল।
আজ হুদহুদ ঠাট্টা করল না। ঝুঁটিটাও ফোলাল না।
"আজকের আয়াতটা পড়ব," সে বলল। "তারপর তোমাকে একটা কথা বলব — যেটা বলার জন্য আমি আট সপ্তাহ অপেক্ষা করেছি।"
সে পড়ল:
أَرَءَيْتَ إِن كَذَّبَ وَتَوَلَّىٰ (আরাআইতা ইন কায্যাবা ওয়া তাওয়াল্লা — বলো তো, যদি সে মিথ্যারোপ করে এবং মুখ ফিরিয়ে নেয়?)
হুদহুদ থেমে গেল।
মাহদী শব্দটা চিনে ফেলেছে। বুকটা ধুকপুক করছে।
"كَذَّبَ," সে ফিসফিস করে বলল।
"হ্যাঁ।" হুদহুদ মাটির দিকে তাকিয়ে আছে। "সূরা মাউনে তুমি প্রথম শব্দটা শুনেছিলে — يُكَذِّبُ। মনে আছে আমি কী বলেছিলাম?"
"বলেছিলে মনে রাখতে। বলেছিলে একদিন এই শব্দের সবচেয়ে ভয়ংকর রূপটা শুনব।"
"আর সূরা তীনে আবার এল — يُكَذِّبُكَ। আর আজ — كَذَّبَ।"
হুদহুদ ধীরে ধীরে ডানা গুটিয়ে নিল।
"এবার শোনো, মাহদী বিন মামুন।"
"যে ছায়াটা প্রথম রাত থেকে জঙ্গলে ফিসফিস করছে — যার নাম আমি এতদিন বলিনি — তার আসল নাম ٱلدَّجَّال (আদ-দাজ্জাল)।"
জঙ্গলের ফিসফিসানিটা হঠাৎ থেমে গেল। যেন কেউ কান পেতেছে।
"দাজ্জাল মানে কী?" মাহদীর গলা কাঁপল।
"মানে — যে ঢেকে দেয়, যে মিথ্যাকে সত্যের রং মাখিয়ে দেখায়। খাঁটি জিনিসের উপর নকলের প্রলেপ।"
"আর তার আরেকটা নাম আছে। নবীজি (সা.) তাকে ডেকেছেন — ٱلْكَذَّاب (আল-কায্যাব)।"
মাহদী স্থির হয়ে গেল।
"কাযযাব," সে আস্তে বলল। "আজই তো তুমি ছাঁচটা শেখালে। যে বারবার, অভ্যাসের মতো মিথ্যা বলে।"
"এইজন্যই আমি ব্যাকরণটা আজকেই শেখালাম, সেনাপতি।" হুদহুদ প্রথমবার মাহদীর চোখের দিকে তাকাল। "তুমি তার নামটা ব্যাকরণ দিয়ে চিনে ফেলেছ। তলোয়ার দিয়ে নয়।"
"সে কে, হুদহুদ?"
"কিয়ামতের আগে সে আসবে। নবীজি (সা.) তার সম্পর্কে যতটা সতর্ক করেছেন, আর কোনো বিপদ নিয়ে ততটা করেননি। প্রত্যেক নবী নিজের উম্মতকে তার ভয় দেখিয়ে গেছেন।"
"তার অস্ত্র কী? তলোয়ার?"
"না।" হুদহুদ মাথা নাড়ল। "তার অস্ত্র চোখের ধোঁকা। সে দেখাবে এক জিনিস, সত্য হবে আরেকটা। সে দাবি করবে সে-ই সব — অথচ সে এক চোখে কানা, আর আল্লাহ কানা নন।"
"নবীজি (সা.) বলেছেন, তার দুই চোখের মাঝখানে লেখা থাকবে ك ف ر — আর প্রত্যেক ঈমানদার সেটা পড়তে পারবে, লেখাপড়া জানুক বা না জানুক।"
📚 সহীহ বুখারী ৭১৩১, সহীহ মুসলিম ২৯৩৩
মাহদী অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল —
"হুদহুদ, আজ রাতে আম্মু আমাকে একটা ভিডিও দেখিয়েছেন। একজন মানুষ এমন কথা বলছেন যা তিনি কোনোদিন বলেননি। আম্মু বললেন কম্পিউটার দিয়ে বানানো।"
হুদহুদ ধীরে মাথা নাড়ল।
"তাহলে সেটাও কি দাজ্জাল?"
"না। আর এইটা খুব ভালো করে বুঝে নাও, মাহদী — নইলে বড় হয়ে তুমি ঠকবে।"
সে সোজা হয়ে বসল।
"হাদিসে ডিপফেকের কথা নেই। ইন্টারনেটের কথা নেই। কোনো যন্ত্রের কথা নেই। কেউ যদি বলে নবীজি (সা.) ডিপফেকের কথা বলে গেছেন — সে বাড়িয়ে বলছে।"
"তাহলে সম্পর্কটা কী?"
"সম্পর্ক হলো একটা মিল, একটা উপমা। ডিপফেক তোমাকে শিখিয়ে দিচ্ছে চোখের ধোঁকা জিনিসটা কেমন হয় — যেটা আগের যুগের মানুষ কল্পনাও করতে পারত না। এটুকুই।"
"বুঝেছ পার্থক্যটা? এটা বোঝার সিঁড়ি, প্রমাণ নয়।"
"বুঝেছি।"
"তাহলে আজকের শিক্ষাটা বলো।"
মাহদী একটু ভাবল। তারপর বলল — "চোখে যা দেখি, সবই সত্য নয়। জ্ঞান দিয়ে যাচাই করতে হয়।"
হুদহুদ প্রথমবার আজ ঝুঁটিটা ফোলাল।
"আর এইজন্যই," সে বলল, "তোমার রব প্রথম দিনেই বলেছিলেন — ٱقْرَأْ।" 👁️