🗺️ আজকের অভিযান
তাসমিয়া দরজা ঠেলে হুড়মুড় করে মাহদীর ঘরে ঢুকে পড়ল।
"ভাইয়া, দেখো আমি কী এঁকেছি!"
মাহদী তখন সবেমাত্র মুখস্থে মন বসিয়েছে। সে বিরক্ত হয়ে চেঁচিয়ে উঠল, "নক করে ঢুকতে পারিস না? এটা আমার ঘর!"
তাসমিয়ার হাত থেকে কাগজটা নেমে গেল। সে কিছু না বলে বেরিয়ে গেল।
একটু পরে দাদি এসে দরজায় দাঁড়ালেন। তিনি নক করলেন।
"ভেতরে আসতে পারি?"
মাহদী লজ্জা পেয়ে গেল। "দাদি, আপনি আবার নক করছেন কেন!"
দাদি ভেতরে এসে বসলেন। "তুমি ঠিকই বলেছ, দাদুভাই — অনুমতি নিয়ে ঢুকতে হয়। কুরআনেই আল্লাহ এই নিয়ম শিখিয়েছেন, নাম ইসতিযান।"
"তাহলে তাসমিয়া..."
"তাসমিয়া ভুল করেছে। কিন্তু একটা প্রশ্ন করি?" দাদি চশমার উপর দিয়ে তাকালেন। "তুমি আম্মুর ঘরে ঢোকার সময় নক করো?"
মাহদী মুখ খুলল। আবার বন্ধ করল।
"যে নিয়মটা নিজের জন্য চাও," দাদি উঠতে উঠতে বললেন, "সেটা আগে নিজে মানো। নইলে ওটা নিয়ম নয়, ওটা অস্ত্র।"
সেই রাতে কদরের রাত ফুরিয়ে আসছে। ভোরের প্রথম আভা ফুটছে দিগন্তে।
মাহদী দেখল ফেরেশতারা ফিরে যাচ্ছেন আকাশের দিকে — আলোর সিঁড়ি বেয়ে, সারি বেঁধে।
"তাঁরা কী নিয়ে যাচ্ছেন?"
"তোমাদের নাম," হুদহুদ বলল। "কে এই রাতে জেগে ছিল, কে কী চেয়েছে — সব লিখে নিয়ে যাচ্ছেন।"
"تَنَزَّلُ ٱلْمَلَـٰٓئِكَةُ وَٱلرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِم مِّن كُلِّ أَمْرٍ (তানায্যালুল মালাইকাতু ওয়ার রূহু ফীহা বিইযনি রব্বিহিম মিন কুল্লি আমর — সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রূহ নেমে আসেন তাঁদের রবের অনুমতিক্রমে, সকল সিদ্ধান্ত নিয়ে)।"
"ٱلرُّوحُ (আর-রূহ) কে?" মাহদী জানতে চাইল।
"জিবরীল (আ.)। ফেরেশতাদের সেনাপতি — যিনি নবীদের কাছে ওহি নিয়ে আসতেন। তাঁর নাম আলাদা করে বলা হয়েছে, কারণ তিনি সবার বড়।"
হুদহুদ থামল, তারপর মাহদীর দিকে তাকাল। "কিন্তু একটা শব্দ খেয়াল করেছ? بِإِذْنِ رَبِّهِم — তাঁদের রবের অনুমতিক্রমে।"
মাহদী চমকে উঠল।
"হ্যাঁ, মাহদী। অনুমতি। আকাশের সবচেয়ে বড় ফেরেশতাও দরজায় দাঁড়িয়ে অনুমতি নেন। নিজের ইচ্ছায় এক পা-ও নামেন না।"
মাহদীর দাদির কথা মনে পড়ল। যে নিয়মটা নিজের জন্য চাও, সেটা আগে নিজে মানো।
"হুদহুদ, আজ আমি তাসমিয়ার উপর চেঁচিয়েছি। ও নক করেনি বলে।"
"আর তুমি?"
মাহদী মাথা নিচু করল।
হুদহুদ কিছু বলল না। শুধু শেষ আয়াতটা পড়ল — খুব নরম করে:
سَلَـٰمٌ هِىَ حَتَّىٰ مَطْلَعِ ٱلْفَجْرِ (সালামুন হিয়া হাত্তা মাতলাইল ফাজর — শান্তিময় সে রাত, ফজরের আবির্ভাব পর্যন্ত)
"চার সপ্তাহ ধরে এই দ্বীপে তুমি ভূমিকম্প শুনেছ, পাল্লা দেখেছ, কবর দেখেছ," হুদহুদ বলল। "আর সূরাটা শেষ হলো একটাই শব্দ দিয়ে — سَلَام। শান্তি।"
"এটাই কুরআনের ধরন, মাহদী। কঠিন কথার পরে সবসময় একটা দরজা খোলা থাকে।"
তারপর সে হঠাৎ ঝুঁটি নাড়ল, চোখে দুষ্টুমি। "আচ্ছা, আয়াতটা কোথায় গিয়ে শেষ হলো বলো তো?"
"مَطْلَعِ ٱلْفَجْرِ — ফজরের আবির্ভাব পর্যন্ত।"
"আর তোমার এই দ্বীপে আসা প্রতিরাতে কোথায় গিয়ে শেষ হয়?"
মাহদী হাঁ করে তাকিয়ে রইল।
"ফজরের আজানে," সে ফিসফিস করে বলল।
হুদহুদ ডানা মেলল। "তাহলে আয়াতটা তোমার কথাই বলছে, সেনাপতি।" 🪶
📜 গল্প: হাজার মাসের হিসাব
বর্ণিত আছে, নবীজি (সা.) একবার আগের যুগের এক ইবাদতগুজার মানুষের কথা বললেন, যিনি হাজার মাস আল্লাহর পথে কাটিয়ে দিয়েছিলেন।
সাহাবিরা শুনে মন খারাপ করে ফেললেন। কারণ তাঁরা জানতেন, এই উম্মতের মানুষ এত দীর্ঘ আয়ু পাবে না। আমরা তো ষাট-সত্তর বছর বাঁচি! আমরা কীভাবে ওদের সমান হব?
তখন আল্লাহ এই সূরাটা নাযিল করলেন।
হাজার মাস মানে তিরাশি বছর চার মাস — একটা গোটা মানুষের জীবন। আর আল্লাহ বললেন, একটা রাত সেটার চেয়েও ভালো।
ভাবো তো, এটা কত বড় উপহার! আল্লাহ এই উম্মতের ছোট্ট আয়ুকে এক রাতে বড় করে দিলেন।
সূরায় আরও দুটো আশ্চর্য জিনিস আছে।
এক — পাঁচ আয়াতে তিনবার "লাইলাতুল কদর" বলা হয়েছে। আল্লাহ যখন কোনো নাম বারবার নেন, বুঝতে হবে জিনিসটা কত মূল্যবান।
দুই — সূরাটা শেষ হয় سَلَام (সালাম — শান্তি) শব্দ দিয়ে, আর শেষ হয় ঠিক ফজরে।
রাতটা যেখানে শেষ, তোমার দিনটা সেখানেই শুরু। 🌙
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? সূরাটা প্রমাণ করে আল্লাহর হিসাব মানুষের হিসাবের মতো নয়। তুমি ছোট, তোমার সময় কম — কিন্তু তোমার রব বড়। একটা রাত একটা জীবনকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
🕌 কোথায় কাজে লাগাব
- রমজানের শেষ দশ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে (২১, ২৩, ২৫, ২৭, ২৯) জেগে থেকো।
- ওই রাতে বেশি বেশি পড়ো: ٱللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ ٱلْعَفْوَ فَٱعْفُ عَنِّى (আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা'ফু আন্নী) — আয়েশা (রা.) নবীজিকে (সা.) জিজ্ঞেস করে এই দোয়াটাই শিখেছিলেন।
- নিজেকে ছোট বা দেরি হয়ে গেছে মনে হলে এই সূরাটা পড়ো।