🗺️ আজকের অভিযান
রাতে খাবার টেবিলে মাহদীর মুখ ভার।
"চাচাতো ভাই নতুন সাইকেল পেয়েছে," সে ভাত নাড়তে নাড়তে বলল। "গিয়ার লাগানো। আমার তো কিছুই নেই।"
নানা চুপচাপ খাচ্ছিলেন। কিছু বললেন না।
রাতে বৃষ্টি নামল — শ্রাবণের ঝুম বৃষ্টি। মাহদী পানি খেতে উঠে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল।
গেটের পাশে কালু বসে আছে। নানার বাড়ির পাহারাদার কুকুর। ভিজে চুপচুপে, কান দুটো ঝুলে পড়েছে, কিন্তু বসে আছে সোজা হয়ে — গেটের দিকে মুখ করে।
সকালে মাহদী নানাকে জিজ্ঞেস করল, "নানা, কালু বৃষ্টিতে ভেতরে আসে না কেন? আমি তো ডেকেছিলাম।"
"আসবে না," নানা চা ঢালতে ঢালতে বললেন। "সাত বছর ধরে ওই গেট ওর। কেউ ওকে বলেনি বসে থাকতে, কেউ ওকে বেতনও দেয় না।"
তিনি কাপটা নামিয়ে মাহদীর দিকে তাকালেন।
"কাল রাতে ওই কুকুরটা ভিজতে ভিজতে পাহারা দিল। আর আমার নাতি ভাত নাড়তে নাড়তে বলল, আমার তো কিছুই নেই।"
মাহদী মাথা তুলতে পারল না।
সেই রাতে দ্বীপে হঠাৎ খট-খট-খট! ধুলো উড়িয়ে ছুটে এল একদল ঘোড়া। খুরের আঘাতে পাথর থেকে আগুনের ফুলকি ছিটকাচ্ছে!
"সুবহানাল্লাহ, কী সুন্দর!" মাহদী মুগ্ধ হয়ে বলল।
"সূরা আদিয়াতে আল্লাহ এই ঘোড়াদেরই শপথ করেছেন," হুদহুদ বলল। "وَٱلْعَـٰدِيَـٰتِ ضَبْحًا (ওয়াল আদিয়াতি দাবহা — শপথ হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ানো ঘোড়াদের)।"
"ضَبْح (দাবহ) মানে ছোটার সময় ঘোড়ার নিঃশ্বাসের শব্দ। ভাবো তো — আল্লাহ ওদের নিঃশ্বাসটা পর্যন্ত আয়াতে রেখে দিলেন!"
পাঁচটা দৃশ্য একটার পর একটা ভেসে উঠল — ছুটছে, ফুলকি উড়ছে, ভোরবেলা ঝাঁপিয়ে পড়ছে, ধুলো উড়ছে, শত্রুদলের মাঝখানে ঢুকে পড়ছে।
"এত সুন্দর শপথের পর আল্লাহ কী বললেন জানো?" হুদহুদ থামল।
"إِنَّ ٱلْإِنسَـٰنَ لِرَبِّهِۦ لَكَنُودٌ (ইন্নাল ইনসানা লিরব্বিহি লাকানূদ — নিশ্চয়ই মানুষ তার রবের প্রতি বড়ই অকৃতজ্ঞ)।"
মাহদী ভুরু কুঁচকাল। "ঘোড়ার প্রশংসা করে হঠাৎ মানুষের নিন্দা? দুটোর সম্পর্ক কী?"
"চমৎকার প্রশ্ন!" হুদহুদ খুশি হলো। "তুলনাটাই আসল কথা।"
"ঘোড়াটা দেখো — মনিবের জন্য জীবন দিয়ে ছুটছে, বুক ফেটে যাচ্ছে, তবু থামছে না। ওকে কেউ কিছু দেয়নি। এক মুঠো ঘাস, ব্যস। তবু সে বিশ্বস্ত।"
"আর মানুষ? আল্লাহ তাকে চোখ দিলেন, হাত দিলেন, মা দিলেন, ভাত দিলেন — আর সে বলে আমার তো কিছুই নেই।"
মাহদীর গলা শুকিয়ে গেল। কাল রাতের ভেজা কালুর ছবিটা চোখে ভাসল।
"كَنُود (কানূদ) শব্দটার মানে জানো?" হুদহুদ বলল। "এমন জমি, যেখানে বৃষ্টি পড়ে, রোদ পড়ে, সার পড়ে — অথচ কিছুই জন্মায় না। সব নেয়, কিছুই ফেরত দেয় না।"
সে মাহদীর কাঁধে বসল। "তোমার নানা কৃষিব্যবসা করেন। এমন জমির নাম শুনলে উনি কী বলতেন?"
"বলতেন... ওই জমি আর রাখা যাবে না।"
"আল্লাহ কিন্তু রেখে দিয়েছেন," হুদহুদ নরম গলায় বলল। "চৌদ্দশো বছর ধরে অভিযোগটা লেখা আছে, তবু বৃষ্টি বন্ধ হয়নি। এইটাই রহমত।" 🐎