🗺️ আজকের অভিযান
আম্মু আজ মাহদীকে নানার ক্ষেতে নিয়ে গেছেন। হাতে একটা ছোট্ট বাক্স, ভেতরে সরু সরু কাঠির মতো জিনিস।
"এগুলো কী আম্মু?"
"সেন্সর।" আম্মু হাঁটু গেড়ে বসে একটা কাঠি মাটিতে ঢুকিয়ে দিলেন। তারপর ফোনটা বের করলেন।
স্ক্রিনে সংখ্যা ফুটে উঠল — আর্দ্রতা ৩৪%। তাপ ২৮°। লবণ কম।
মাহদীর চোখ বড় হয়ে গেল। "মাটি ফোনে কথা বলছে?!"
"অনেকটা তাই।" আম্মু হাসলেন। "মাটি সবসময়ই কথা বলে, বাবা। আমরা এতদিন ভাষাটা জানতাম না। এখন যন্ত্রটা অনুবাদ করে দেয়।"
"মাটি আর কী কী জানে?"
"অনেক কিছু। কবে শেষ বৃষ্টি হয়েছিল, কোন সার দেওয়া হয়েছিল, ক্ষেতটা কতবার পুড়েছে। বিজ্ঞানীরা গাছের গুঁড়ির রিং গুনে বলে দিতে পারেন কত বছর আগে খরা হয়েছিল। মেরুর বরফের স্তর কেটে হাজার বছর আগের বাতাস পর্যন্ত পরীক্ষা করা যায়।"
মাহদী মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। এত সাধারণ, এত চুপচাপ — অথচ ভেতরে এতকিছু জমা!
"আম্মু, আমাদের হুজুর একটা আয়াত পড়েছিলেন — কিয়ামতের দিন মাটি নাকি সব বলে দেবে। তার মানে এই সেন্সরগুলোই?"
আম্মু ফোনটা নামিয়ে রাখলেন। "না, বাবা। আর এইখানে খুব সাবধান হতে হবে। তিনটে কথা আলাদা করে শোনো।"
"এক — কুরআন যা বলছে। সেদিন যমীন তার খবর বলে দেবে, কারণ তার রব তাকে হুকুম দেবেন। এটা আল্লাহর হুকুমে ঘটবে, কোনো যন্ত্রে নয়।"
"দুই — বিজ্ঞান যা করছে। আমরা মাটির অবস্থা মাপতে পারি — কতটা ভেজা, কতটা গরম, কী কী রাসায়নিক মিশে আছে। এটুকুই।"
"তিন — যেখানে দুটো মেলে না।" আম্মু সেন্সরটা তুলে ধরলেন। "এই যন্ত্র কোনোদিন বলতে পারবে না এই ক্ষেতে কে চুরি করেছিল বা কে এখানে নামাজ পড়েছিল। এটা রসায়ন মাপে, কাজের সাক্ষ্য দেয় না। তাই কেউ যদি বলে কুরআন সেন্সরের কথা বলেছে — সেটা ভুল কথা।"
"তাহলে সেন্সরটা দিয়ে কী লাভ?"
"লাভ হলো অবাক হওয়া," আম্মু হাসলেন। "যন্ত্র দেখে অবাক হও। তারপর আয়াতটা পড়ে আরও বেশি অবাক হও। কিন্তু দুটোকে জোর করে এক বানিয়ো না — তোমার দাদা তো তোমাকে এটাই শিখিয়েছেন, তাই না?"
সেই রাতে জাহাজ থামল নতুন এক দ্বীপে। কিন্তু পা রাখতেই — মাটি কেঁপে উঠল।
মাহদী টাল সামলাতে না পেরে বসে পড়ল। হুদহুদ ডানা মেলে ভাসতে ভাসতে বলল, "ভয় নেই! এই দ্বীপ সবসময় কাঁপে। এর নাম তুলাদণ্ডের দ্বীপ — এখানে সবকিছু ওজন হয়।"
"إِذَا زُلْزِلَتِ ٱلْأَرْضُ زِلْزَالَهَا (ইযা যুলযিলাতিল আরদু যিলযালাহা — যখন যমীনকে তার নিজের কম্পনে কাঁপানো হবে)।"
"তার নিজের কম্পন?" মাহদী জিজ্ঞেস করল।
"হ্যাঁ। যে কম্পন শুধু একবারই আসে — যেটার জন্য পৃথিবীটা তৈরি হয়ে আছে।"
হঠাৎ মাটি ফাটতে শুরু করল, আর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল... জিনিসপত্র। পুরনো চিঠি, ভাঙা খেলনা, হারিয়ে যাওয়া পয়সা, মরচে ধরা চাবি।
"পৃথিবী তার أَثْقَال (আসকাল — বোঝা, ভেতরে জমা জিনিস) বের করে দিচ্ছে," হুদহুদ বলল।
মাহদী ঝুঁকে দেখল — বেরিয়ে আসা প্রতিটা জিনিসের গায়ে কারো না কারো নাম লেখা।
"আর মানুষ তখন কী বলবে জানো?" হুদহুদ বলল। "وَقَالَ ٱلْإِنسَـٰنُ مَا لَهَا (ওয়া কালাল ইনসানু মা লাহা — আর মানুষ বলবে: এর কী হলো?)"
"শুধু এইটুকু? এর কী হলো?"
"হ্যাঁ। মাত্র তিনটে শব্দ। কারণ সেদিন মানুষের মুখে আর কিছু আসবে না।"
তারপর কাঁপুনি থেমে গেল। আর এমন এক নিস্তব্ধতা নামল যে মাহদীর নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে।
হুদহুদ ফিসফিস করে শেষ আয়াতটা বলল: "يَوْمَئِذٍ تُحَدِّثُ أَخْبَارَهَا (ইয়াওমাইযিন তুহাদ্দিসু আখবারাহা — সেদিন সে তার খবর বর্ণনা করবে)।"
"أَخْبَار (আখবার) — শব্দটা চেনা লাগছে?"
মাহদী চমকে উঠল। "খবর! আমরা তো রোজ বলি — টিভিতে খবর, খবরের কাগজ!"
"ঠিক তাই। সেদিন মাটি খবর পড়বে।" হুদহুদ নিচের দিকে তাকাল। "তুমি যে মাটিতে হাঁটো, খেলো, নামাজ পড়ো — সে সব শুনছে, দেখছে, জমিয়ে রাখছে।"
মাহদীর আম্মুর সেন্সরটার কথা মনে পড়ল, মাটির ভেতর গেঁথে থাকা সরু কাঠিটা।
"ভয় লাগছে?" হুদহুদ মাথা কাত করল। "তাহলে একটা সুখবর দিই — মাটি কিন্তু শুধু খারাপটা বলবে না। ভালোটাও বলবে। তুমি যেখানে দাঁড়িয়ে দুই রাকাত পড়েছ, সেই জায়গাটা সেদিন তোমার পক্ষে কথা বলবে।" 🌍