🗺️ আজকের অভিযান
নানার আড়তে দেয়ালে একটা পুরনো ক্যালেন্ডার ঝোলে — কিন্তু অদ্ভুত ক্যালেন্ডার। তারিখের পাশে চাঁদের ছোট ছোট ছবি আঁকা।
"নানা, এই চাঁদগুলো কেন?"
"ওটা কৃষকের ক্যালেন্ডার," নানা বললেন। "আমার বাবা এভাবেই হিসাব রাখতেন, তাঁর বাবাও।"
"চাঁদ দিয়ে চাষ হয়?"
"হয় রে দাদুভাই। জোয়ার-ভাটা চাঁদ ধরে চলে। নদীর পানি কখন লবণাক্ত হবে, কখন মিঠা — সব ওই হিসাবে। আমাদের সাতক্ষীরায় এটা না জানলে চাষ হয় না।"
তিনি ক্যালেন্ডারটার দিকে তাকালেন।
"সূর্য দেয় ঋতু, চাঁদ দেয় মাস। দুটোই ঘড়ি, দুই রকম।"
রাতে মাহদী দাদাকে কথাটা বলল।
"তোমার নানা ঠিক বলেছেন," দাদা বললেন। "কিন্তু আজ তোমাকে আরেকটা জিনিস শেখাব — আর খুব সাবধানে শোনো, কারণ এখানে মানুষ প্রায়ই ভুল করে।"
"কী দাদা?"
"অনেকে বলে বেড়ায় — দেখো, কুরআন সূর্যকে বলেছে ضِيَاء (আলোর উৎস) আর চাঁদকে نُور (আলো)। মানে কুরআন আগেই জানত চাঁদের নিজের আলো নেই!"
"সত্যি নয়?"
দাদা চশমাটা নামালেন। "তিন ভাগে শোনো।"
"এক — কুরআন যা করেছে। সত্যিই দুটো আলাদা শব্দ ব্যবহার করেছে। এটা ঠিক, এটা সুন্দর।"
"দুই — বিজ্ঞান যা বলে। চাঁদের নিজের আলো নেই, সে সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে। এটাও ঠিক।"
"তিন — যেখানে মিলটা টানা যাবে না।" দাদা আঙুল তুললেন। "আরবি ভাষায় ضِيَاء আর نُور — দুটো শব্দই আলো বোঝায়। কড়া রোদ আর জ্যোৎস্না যে এক জিনিস নয়, সেটা মরুভূমির মানুষ চোখেই দেখত। আয়াতটা প্রতিফলনের কথা বলেনি।"
"তাহলে?"
"তাহলে এটা বলা যায় না কুরআন প্রমাণ করে দিয়েছে। বললে একদিন কেউ প্রশ্ন করবে, আর তুমি উত্তর দিতে পারবে না — তখন বিশ্বাসটাই নড়ে যাবে।"
দাদা হাসলেন। "কিন্তু একটা জিনিস তুমি অবাক হয়ে ভাবতে পারো, দাদুভাই। আল্লাহ যে দুটোর জন্য দুটো আলাদা শব্দ বেছেছেন — এটাই তো সুন্দর। অবাক হও, কিন্তু বাড়িয়ে বোলো না।"
সেই রাতে দ্বীপে আকাশটা অন্যরকম। মাহদী মুখ তুলে দেখল — সূর্য আর চাঁদ একসাথে, দুই দিগন্তে।
"নতুন সূরা," হুদহুদ বলল। "নাম আশ-শামস — সূর্য। আর এখানে আল্লাহ পরপর সাতটা শপথ করেছেন।"
"সাতটা?!"
"গুনে দেখো।"
সে পড়তে শুরু করল, আর প্রতিটা শপথে আকাশের একটা করে অংশ জ্বলে উঠল:
وَٱلشَّمْسِ وَضُحَىٰهَا (ওয়াশ শামসি ওয়া দুহাহা — শপথ সূর্যের ও তার কিরণের)
وَٱلْقَمَرِ إِذَا تَلَىٰهَا (ওয়াল কামারি ইযা তালাহা — শপথ চাঁদের, যখন সে সূর্যের পেছনে আসে)
"تَلَىٰهَا শব্দটা খেয়াল করো," হুদহুদ বলল। "মানে তার পেছনে পেছনে আসে। চাঁদ সূর্যের পিছু নেয় — যেন ছোট ভাই বড় ভাইয়ের পেছনে।"
মাহদীর নানার ক্যালেন্ডারের কথা মনে পড়ল।
وَٱلنَّهَارِ إِذَا جَلَّىٰهَا (ওয়ান নাহারি ইযা জাল্লাহা — শপথ দিনের, যখন সে সূর্যকে প্রকাশ করে)
وَٱلَّيْلِ إِذَا يَغْشَىٰهَا (ওয়াল্লাইলি ইযা ইয়াগশাহা — শপথ রাতের, যখন সে সূর্যকে ঢেকে দেয়)
"খেয়াল করো — একটা প্রকাশ করে, আরেকটা ঢেকে দেয়," হুদহুদ বলল। "কুরআন সবসময় জোড়ায় জোড়ায় চলে।"
وَٱلسَّمَآءِ وَمَا بَنَىٰهَا (ওয়াস সামাই ওয়া মা বানাহা — শপথ আকাশের, আর যিনি তা নির্মাণ করেছেন)
মাহদী থামাল। "হুদহুদ, এবার শপথটা আকাশের নয় — যিনি আকাশ বানিয়েছেন তাঁর!"
"বাহ্!" হুদহুদ ডানা ঝাপটাল। "তুমি সিঁড়িটা ধরে ফেলেছ, সেনাপতি! আল্লাহ আস্তে আস্তে সৃষ্টি থেকে স্রষ্টার দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।"
মাহদী আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল — সূর্য, চাঁদ, দিন, রাত।
"সাতটা শপথ কোথায় গিয়ে থামবে?"
হুদহুদ রহস্য করে হাসল। "কাল। আর তুমি চমকে যাবে — কারণ শেষ শপথটা এই আকাশের কিছু নিয়ে নয়।" 🌙