🗺️ আজকের অভিযান
ক্লাস ৩৪-এর পর থেকে মাহদী রোজ রাতে একটাই দোয়া করত। প্রতি নামাজের পর হাত তুলে বলত — "ইয়া আল্লাহ, আব্বুকে তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে দাও।"
তিন সপ্তাহ। রোজ।
তারপর একদিন আম্মু বললেন, "তোমার আব্বুর কাজ শেষ হতে আরও দেরি হবে। একটা পরীক্ষা পিছিয়ে গেছে।"
মাহদী কিছু বলল না। ঘরে গিয়ে দরজা লাগাল না, কাঁদলও না। শুধু সেই রাতে নামাজের পর হাত তুলল না।
পরদিনও না। তার পরদিনও না।
নানি তাহুরা বেগম এসেছিলেন বেড়াতে। তিনি চুপচাপ লক্ষ করলেন।
চার নম্বর দিন বিকেলে তিনি মাহদীকে পাশে বসালেন, হাতে পান-সুপারির বাটা।
"দোয়া করা ছেড়ে দিয়েছ কেন, দাদুভাই?"
মাহদী কাঁধ ঝাঁকাল। "উত্তর তো আসে না।"
নানি অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, "তোমার আম্মু যখন খুব ছোট, তখন তোমার নানার ব্যবসা একবার একদম ভেঙে পড়েছিল। এক পয়সাও ছিল না। ঘরে চাল বাড়ন্ত।"
"আমি দুই বছর দোয়া করেছি, দাদুভাই। দুই বছর। কোনো উত্তর আসেনি।"
"তারপর?"
"তারপর তোমার নানা যে জমিটা বিক্রি করতে চেয়েছিলেন, সেটা কেউ কিনল না। উনি রেগে গেলেন। ওই জমিতেই পরের বছর প্রথম আড়তটা হলো।"
নানি পান মুখে দিলেন।
"বুঝলে? আল্লাহ চুপ ছিলেন না। তিনি রান্না করছিলেন। রান্না হতে সময় লাগে, আর ঢাকনা তোলা যায় না বারবার।"
সেই রাতে দ্বীপে সকালের নরম আলো ছড়িয়ে পড়েছে। ٱلضُّحَىٰ (আদ-দুহা — পূর্বাহ্নের রোদ)।
"আজ তোমাকে একটা গল্প বলব," হুদহুদ বলল। "যেদিন নবীজির (সা.) কাছেও উত্তর আসা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।"
মাহদী চমকে তাকাল।
"হ্যাঁ, শুনেছ ঠিকই। কিছুদিনের জন্য কোনো ওহি নামল না। জিবরীল (আ.) এলেন না।"
"মক্কার লোকেরা তখন হেসে বলল — দেখো দেখো, ওর রব ওকে ছেড়ে দিয়েছে!"
"তিনি কী করলেন?" মাহদী জিজ্ঞেস করল।
"খুব কষ্ট পেলেন। ভাবতে লাগলেন — আমি কি কোনো ভুল করে ফেলেছি? তিনি কি আমার উপর রাগ করেছেন?"
মাহদী চুপ করে শুনছিল। বুকের ভেতরটা কেমন করছিল।
"তারপর এই সূরা নামল।" হুদহুদ বলল। "আর আল্লাহ শুরু করলেন দুটো শপথ দিয়ে — وَٱلضُّحَىٰ · وَٱلَّيْلِ إِذَا سَجَىٰ (ওয়াদ দুহা · ওয়াল্লাইলি ইযা সাজা — শপথ পূর্বাহ্নের, আর শপথ রাতের যখন তা নিঝুম হয়)।"
"সকালের আলো, আর রাতের নিস্তব্ধতা। ভেবে দেখো মাহদী — কেন এই দুটোরই শপথ?"
মাহদী একটু ভাবল। "কারণ... দুটোই আসে?"
"বাহ্!" হুদহুদ ডানা ঝাপটাল। "আর রাত এলে তুমি কি ভাবো সূর্য মরে গেছে? না! রাতটাও আল্লাহর, আর তিনি রাতেরও শপথ করেছেন।"
তারপর সে আসল লাইনটা বলল, খুব ধীরে:
مَا وَدَّعَكَ رَبُّكَ وَمَا قَلَىٰ (মা ওয়াদ্দাআকা রব্বুকা ওয়া মা কালা — আপনার রব আপনাকে পরিত্যাগ করেননি, আর অসন্তুষ্টও হননি)
"শব্দটা খেয়াল করো — رَبُّكَ। শুধু রব নয়, তোমার রব। যেন বলছেন: চুপ থেকেছি ঠিকই, কিন্তু আমি এখনো তোমারই।"
মাহদীর গলা আটকে এল। "হুদহুদ, আমি চার দিন হাত তুলিনি।"
"জানি।"
"আমি ভেবেছিলাম উনি শুনছেন না।"
হুদহুদ পরের আয়াত দুটো পড়ল:
وَلَلْـَٔاخِرَةُ خَيْرٌ لَّكَ مِنَ ٱلْأُولَىٰ (ওয়ালাল আখিরাতু খইরুল লাকা মিনাল ঊলা — আর পরেরটা তোমার জন্য আগেরটার চেয়ে ভালো)
وَلَسَوْفَ يُعْطِيكَ رَبُّكَ فَتَرْضَىٰ (ওয়ালাসাওফা ইউ'তীকা রব্বুকা ফাতারদা — আর অচিরেই তোমার রব তোমাকে দেবেন, ফলে তুমি সন্তুষ্ট হবে)
"শেষ শব্দটা শোনো — فَتَرْضَىٰ। যতক্ষণ না তুমি সন্তুষ্ট হও।"
"আল্লাহ বলেননি আমি তোমাকে যা চাও তা দেব। বলেছেন — আমি দিতে থাকব যতক্ষণ না তুমি রাজি হয়ে যাও। এটা আরও বড় প্রতিশ্রুতি, মাহদী।"
মাহদীর নানির কথাটা মনে পড়ল। তিনি রান্না করছিলেন।
"তাহলে চুপ থাকা মানে..."
"চুপ থাকা মানে ছেড়ে দেওয়া নয়।" হুদহুদ ডানা মেলল। "কখনো কখনো তিনি চুপ থাকেন, কারণ ভেতরে আরও ভালো কিছু তৈরি হচ্ছে।"
"আজ রাতে হাত তুলবে তো, সেনাপতি?" ☀️