🗺️ আজকের অভিযান
ঘুম ভাঙল ফজরের আজানে।
কিন্তু আজ অন্যরকম।
মাহদী চোখ খুলে কিছুক্ষণ চুপ করে শুয়ে রইল। জানালা দিয়ে ভোরের আলো ঢুকছে। বাইরে বৃষ্টি হয়ে গেছে রাতে — কদমগাছ থেকে টুপটাপ পানি পড়ছে।
ঠিক প্রথম রাতের মতো।
সে জানত।
আজ আর ফেরা হবে না।
কাল রাতে গুহার শেষ প্রান্তে সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে হুদহুদ তাকে যা বলেছিল, সেটা এখনো কানে বাজছে।
সে উঠে বসল। কায়দাটা বুকের উপর — ঠিক যেমন প্রথম রাতে ছিল।
শুধু আজ ওটা আর কায়দা নয়। মুসহাফ।
ফজর।
মাহদী জায়নামাজে দাঁড়াল।
আর তারপর যা হলো, সেটার জন্য সে প্রস্তুত ছিল না।
ٱللَّهُ أَكْبَر — আল্লাহ সবচেয়ে বড়। أَكْبَر — أَفْعَل ছাঁচ, ক্লাস ৩৩।
ٱلْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ ٱلْعَـٰلَمِينَ — সব প্রশংসা আল্লাহর, সব জগতের প্রতিপালকের।
সে থেমে গেল প্রায়।
চব্বিশ সপ্তাহ আগে এই দুইটা শব্দের সামনে সে চুপ করে দাঁড়িয়েছিল।
ٱلرَّحْمَـٰنِ ٱلرَّحِيمِ — পরম দয়াময়, অতি দয়ালু। তাসমিয়ার প্রশ্নের উত্তর।
مَـٰلِكِ يَوْمِ ٱلدِّينِ — বিচার দিনের মালিক। مَـٰلِك — সূরা মূলক। يَوْم — আসমানের ছয় দিন। ٱلدِّين — সূরা মাউনের সেই শব্দ।
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ — কেবল তোমারই ইবাদত করি, কেবল তোমারই সাহায্য চাই। نَسْتَعِين — ٱسْتَـ ছাঁচ, ক্লাস ৩৯।
আর তারপর এল সেই লাইনটা।
ٱهْدِنَا ٱلصِّرَٰطَ ٱلْمُسْتَقِيمَ
মাহদীর গলা আটকে গেল।
ٱهْدِنَا — আমাদের পথ দেখাও। هُدًى-এর পরিবার। তার নিজের নাম।
ٱلصِّرَٰط — পুলসিরাত। ٱلْمُسْتَقِيم — ق و م পরিবার, ছয়বার দেখা।
সে নামাজ শেষ করল। আর তারপর জায়নামাজেই বসে রইল অনেকক্ষণ।
নয় বছরে এই প্রথম সে নামাজ পড়ল, আর প্রতিটা শব্দ বুঝল।
নাশতার টেবিলে সবাই ছিল। দাদা কাগজ নিয়ে, দাদি চা ঢালছেন, আম্মু ল্যাপটপে, তাসমিয়া রুটি ছিঁড়ছে।
মাহদী এসে বসল।
তারপর বলল, "তাসমিয়া, তোকে একটা কথা বলি।"
"বলো।"
"চব্বিশ সপ্তাহ আগে তুই আমাকে একটা প্রশ্ন করেছিলি। মাদ্রাসা থেকে ফেরার পথে।"
তাসমিয়া ভুরু কুঁচকাল। "আমি অনেক প্রশ্ন করি।"
"এটা মনে থাকবে না তোর।" মাহদী বলল। "তুই জিজ্ঞেস করেছিলি — ইহদিনাস সিরাতাল মুসতাকীম মানে কী?"
টেবিলে সবাই থেমে গেল।
দাদা কাগজটা নামিয়ে রাখলেন।
"তারপর?" তাসমিয়া বলল।
"তারপর আমি চুপ করে ছিলাম। কারণ আমি জানতাম না।"
মাহদী কিছুক্ষণ থামল।
"আজ আমি জানি।"
ঘরটা একদম চুপ।
"ٱهْدِنَا মানে — আমাদের পথ দেখাও। শুধু আমাকে না — আমাদের। কারণ আল্লাহ চান তুই আমার জন্যও চা, আমি তোর জন্যও চাই।"
"ٱلصِّرَٰط মানে পথ। পুলসিরাত যে পথ, সেই পথ।"
"ٱلْمُسْتَقِيم মানে সোজা — যাতে কোনো বাঁক নেই।"
তাসমিয়া হাঁ করে শুনছিল।
"কিন্তু ওটাই তো পুরো কথা না," মাহদী বলল।
"আর কী?"
মাহদী চায়ের কাপটা দুই হাতে ধরল।
"তুই যখন এটা পড়িস, তুই আসলে দোয়া করছিস। ভিক্ষা চাইছিস। বলছিস — আল্লাহ, আমি নিজে নিজে সোজা থাকতে পারব না। তুমি ধরে রাখো।"
"আর দিনে সতেরো বার এটা চাইতে হয়।"
"কেন সতেরো বার?"
মাহদী মুখ তুলল।
"কারণ আমরা দিনে সতেরো বারের চেয়েও বেশি বাঁকা হয়ে যাই।"
কেউ কিছু বলল না অনেকক্ষণ।
তারপর দাদি উঠে গিয়ে মাহদীর মাথায় হাত রাখলেন। তাঁর হাত কাঁপছিল।
আম্মু ল্যাপটপটা বন্ধ করে দিলেন, কিন্তু কিছু বললেন না — শুধু ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
আর দাদা?
দাদা চশমাটা খুলে টেবিলে রাখলেন। তারপর চোখ মুছলেন — এই প্রথম, প্রকাশ্যে।
"চব্বিশ সপ্তাহ আগে," তিনি বললেন, গলা ভেঙে, "আমি এই ছেলেটাকে বলেছিলাম তার নামের মানে হেদায়েতপ্রাপ্ত। আর বলেছিলাম নামটা একটা দায়িত্ব।"
তিনি থামলেন।
"দাদুভাই, তুমি নামটার যোগ্য হয়ে উঠতে শুরু করেছ।"
সেই রাতে মাহদী শুতে গেল।
সে জানত আজ আর দ্বীপ নেই। তবু চোখ বন্ধ করল।
আর অন্ধকারের ভেতর — একবার, শেষবার — সে ডানা ঝাপটানোর শব্দ শুনল।
হুদহুদ জানালার কার্নিশে বসে আছে। ঝুঁটিটা সোনালি।
"তুমি এসেছ!"
"একবারের জন্য," হুদহুদ বলল। "চিঠিটা পৌঁছে দিয়ে যেতে।"
সে ডানার নিচ থেকে কিছু একটা বের করল।
ঢালের ষষ্ঠ টুকরো। সোনালি, বাঁকা, হাতের তালুর মতো।
সে সেটা বসিয়ে দিল।
খট।
আর ঢালটা সম্পূর্ণ হয়ে গেল — ছয় টুকরো, এক গোল চাকতি, ভেতরে আলো।
মাহদী ঢালটা হাতে নিল।
হালকা। ভীষণ হালকা।
"এত হালকা কেন?"
"কারণ এটা কোনো ধাতুর তৈরি নয়, মাহদী।" হুদহুদ বলল। "এটা তুমি যা যা জানো, তা দিয়ে তৈরি।"
মাহদীর চোখ ভরে এল।
"তুমি চলে যাচ্ছ?"
"আমার কাজ শেষ।" হুদহুদ ঝুঁটি নাড়ল। "আমি চিঠি বয়ে বেড়াই, মনে নেই? চিঠি পৌঁছে গেলে ডাকপিয়ন থেকে যায় না।"
"কিন্তু আমার তো এখনো অনেক কিছু জানার বাকি!"
"আছে।" হুদহুদ বলল। "তিনশো একষট্টিটা শব্দ। কুরআনে আরও সতেরোশো বাকি।"
"তাহলে কে শেখাবে?"
হুদহুদ কার্নিশ থেকে ঘুরে তাকাল।
"তোমার দাদা। তোমার হুজুর। তোমার আব্বু, যিনি তিন মাস পরে ফিরছেন। তোমার মুসহাফ, যেটা এখন তোমার সাথে কথা বলে।"
"আর সবচেয়ে বড় শিক্ষক কে জানো?"
"কে?"
"তুমি নিজে — যেদিন তুমি কাউকে শেখাবে।"
হুদহুদ ডানা মেলল।
"শেষ একটা কথা, সেনাপতি।"
"বলো।"
"তুমি দাজ্জালকে হারাওনি। কেউ হারায়নি, আর হারাবেও না — সেটা ঈসা (আ.)-এর কাজ, যেদিন তিনি ফিরে আসবেন।"
"তাহলে আমি কী করেছি?"
"তুমি চিনতে পেরেছ।" হুদহুদ বলল। "আর এটাই তোমার কাজ ছিল।"
"একদিন পৃথিবী ন্যায় আর শান্তিতে ভরে যাবে, মাহদী — যেমন পাত্র পানিতে ভরে যায়। সেদিনের সৈনিকরা কিন্তু সেদিন তৈরি হবে না।"
"তারা আজ তৈরি হচ্ছে। পড়ার টেবিলে। বারান্দায়। শব্দের খাতায়।"
সে উড়ে গেল কার্নিশ থেকে, তারপর একবার ঘুরে এসে মাহদীর জানালায় থামল।
"আসসালামু আলাইকুম, মাহদী বিন মামুন।"
মাহদীর গলা ভেঙে গেল।
"ওয়া আলাইকুমুস সালাম, হুদহুদ।"
আর তারপর — শুধু ভোরের বাতাস, আর কদমগাছ থেকে টুপটাপ পানি পড়ার শব্দ। 🕊️
পরদিন সকাল।
মাহদী উঠে দেখল তাসমিয়া তার টেবিলে বসে আছে, হাতে একটা নতুন খাতা।
"ভাইয়া, একটা প্রশ্ন।"
"কর।"
"তোমার তো একটা দ্বীপ ছিল, তাই না? তুমি ঘুমের মধ্যে বকতে।"
মাহদী কিছু বলল না।
তাসমিয়া খাতাটা খুলল। ভেতরে তার নিজের শব্দের ঝুড়ি — একশো এগারো থেকে বেড়ে এখন একশো আটানব্বই।
"আমার কি একটা দ্বীপ আছে?"
মাহদী বোনের দিকে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ।
তারপর জানালার দিকে তাকাল — যেখানে কাল রাতে একটা সোনালি ঝুঁটিওয়ালা পাখি বসে ছিল।
সে হাসল।
"আছে," সে বলল। "আর তোরটা আমার চেয়েও বড়।"
"সত্যি?!"
"সত্যি। কারণ তুই আমার চেয়ে ভালো একটা কাজ পারিস।"
"কী?"
মাহদী বোনের খাতাটার দিকে আঙুল তুলল।
"তুই প্রশ্ন করতে পারিস। আর সব যাত্রাই শুরু হয় একটা প্রশ্ন দিয়ে।"
"আমার যাত্রাটা তো তোরই একটা প্রশ্ন দিয়ে শুরু হয়েছিল।" 🌅
## 📖 এই বই এখানে শেষ। কিন্তু গল্প নয়।
>
মাহদীর যাত্রা শেষ হলো — চব্বিশ সপ্তাহ, ছয়টা দ্বীপ, ৩০১ আয়াত, ৩৬১টা শব্দ।
>
কিন্তু সেই রাতে জানালার কার্নিশে বসা পাখিটা আরেকটা চিঠি হাতে নিয়ে উড়ে গিয়েছিল।
>
আর সেই চিঠির উপরে লেখা ছিল আরেকটা নাম —
>
# ✨ তাসমিয়া মারইয়াম ✨
>
পরের বইয়ে তাসমিয়ার নিজের যাত্রা। নতুন দ্বীপ, নতুন প্রশ্ন, আর এমন সব বিষয় যা মাহদীও জানে না।
>
কারণ তাসমিয়া একটা কাজ ভাইয়ের চেয়ে ভালো পারে — সে প্রশ্ন করতে জানে।
>
ইনশাআল্লাহ, শীঘ্রই আসছে। 🌙