🗺️ আজকের অভিযান
দুপুরে হঠাৎ মাইকে ঘোষণা শুরু হলো। তারপর সাইরেন।
সাতক্ষীরার মানুষ এই আওয়াজটা চেনে। ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কসংকেত।
কয়েক মিনিটের মধ্যে গোটা পাড়া উল্টে গেল। মানুষ ছুটছে — কেউ ছাগল টানছে, কেউ চালের বস্তা মাথায় নিয়েছে, কেউ বাচ্চা কোলে নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে দৌড়াচ্ছে। এক মহিলা তাঁর হাঁড়ি-পাতিল ফেলে দৌড়ালেন, আরেকজন হাঁড়ি নিয়েই দৌড়ালেন।
মাহদী উঠানে দাঁড়িয়ে দেখল — কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না।
আম্মু ফোনে ফার্মের লোকদের নির্দেশ দিচ্ছেন। "তিন দিন আগেই সংকেত পেয়েছিলাম, ধান তুলে ফেলেছি। যন্ত্রগুলো ঢেকে দাও।"
"আম্মু, আপনি আগে জানলেন কীভাবে?"
"স্যাটেলাইট, সমুদ্রের বয়া, চাপ মাপার যন্ত্র," আম্মু ফোনটা নামালেন। "আজকাল ঝড় আসার তিন-চার দিন আগেই বলে দেওয়া যায়। আগে পারত না — তাই আগে মানুষ অনেক বেশি মরত।"
রাতে ঝড় সাতক্ষীরা ছুঁয়ে গেল না, পাশ কাটিয়ে গেল। কিন্তু মাহদীর কানে সাইরেনটা বাজতেই থাকল।
সেই রাতে দ্বীপে হঠাৎ বিকট এক শব্দ! এত জোরে যে মাহদী দুই হাতে কান চেপে ধরল।
"এটাই ٱلْقَارِعَة (আল-ক্বারিআহ — যে ঠকঠক করে আঘাত করে)," হুদহুদ চেঁচিয়ে বলল। "নামটাই আওয়াজের মতো — ক্বা-রি-আহ! শুনলেই বুক কেঁপে ওঠে।"
"আর দেখো আল্লাহ কীভাবে শুরু করলেন — ٱلْقَارِعَةُ · مَا ٱلْقَارِعَةُ · وَمَآ أَدْرَىٰكَ مَا ٱلْقَارِعَةُ। নামটা তিনবার! যেন কেউ দরজায় তিনবার ধাক্কা দিচ্ছে।"
চারদিকে মানুষ ছুটছে এলোমেলো, ধাক্কা খাচ্ছে, কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না।
মাহদীর আজ দুপুরের কথা মনে পড়ল।
"يَوْمَ يَكُونُ ٱلنَّاسُ كَٱلْفَرَاشِ ٱلْمَبْثُوثِ (ইয়াওমা ইয়াকূনুন নাসু কাল ফারাশিল মাবসূস — সেদিন মানুষ হবে বিক্ষিপ্ত পতঙ্গের মতো)।"
"পতঙ্গ কেন?" মাহদী জিজ্ঞেস করল।
"রাতে বাতির চারপাশে পোকা ওড়া দেখেছ? কোনো লক্ষ্য নেই, শুধু ঘুরছে আর ধাক্কা খাচ্ছে। সেদিন মানুষও তাই — নিজের ছাড়া আর কিছুই মনে থাকবে না।"
তারপর মাহদী উপরে তাকিয়ে দেখল — পাহাড়গুলো উড়ছে। ধুনে রাখা রঙিন তুলোর মতো ভেসে যাচ্ছে।
"وَتَكُونُ ٱلْجِبَالُ كَٱلْعِهْنِ ٱلْمَنفُوشِ (ওয়া তাকূনুল জিবালু কাল ইহনিল মানফূশ — আর পাহাড় হবে ধুনিত রঙিন পশমের মতো)।"
"পাহাড়!" মাহদী বিস্মিত। "পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী জিনিস — উড়ছে তুলোর মতো!"
"তাহলে ভাবো," হুদহুদ শান্তভাবে বলল, "যেদিন পাহাড়ও তুলো হয়ে যায়, সেদিন টাকা-পয়সা, বড় বাড়ি, গিয়ার লাগানো সাইকেল — এসবের ওজন কত হবে?"
মাহদী চুপ।
"হুদহুদ, আজ দুপুরে আমাদের ঝড়ের সাইরেন বেজেছিল। আম্মু বলেছেন তিন দিন আগেই জানা গিয়েছিল।"
"চমৎকার!" হুদহুদ বলল। "তোমার আম্মু ঠিকই বলেছেন — যন্ত্র দিয়ে আজ ঝড়ের খবর আগে পাওয়া যায়, আর তাতে হাজার হাজার মানুষ বাঁচে। এটা আল্লাহরই দেওয়া জ্ঞান।"
"তাহলে ক্বারিআহর সাইরেন কবে বাজবে?"
হুদহুদ মাথা নাড়ল। "কোনো সাইরেন নেই, মাহদী। কোনো যন্ত্র সেদিনের খবর তিন দিন আগে দেবে না, তিন সেকেন্ড আগেও না। নবীজিকেও (সা.) দিন-তারিখ জানানো হয়নি।"
"তাহলে বাঁচার উপায় কী?"
"তোমার আম্মু আজ কী করেছেন? সংকেত পেয়ে আগেই ধান তুলে ফেলেছেন।" হুদহুদ ঝুঁটি ফুলাল। "সংকেত তো এসেই গেছে, সেনাপতি। কুরআনটাই সংকেত। এখন ফসল তোলার পালা।"
আর ঠিক তখনই ধোঁয়ার ভেতর থেকে ভেসে উঠল বিশাল এক দাঁড়িপাল্লা — এত বড় যে উপরটা মেঘ ছুঁয়েছে।
"কাল," হুদহুদ বলল, "আমরা ওটার সামনে গিয়ে দাঁড়াব।" ⚖️