নানার আড়তের অফিসঘরে দেয়ালে একটা ছোট বাঁধানো ছবি ঝোলে। মাহদী কখনো ভালো করে দেখেনি। আজ সে কাছে গিয়ে দেখল — সাদাকালো ছবি, একটা টিনের চালার নিচে বাঁশের খুঁটি, কয়েকটা বস্তা, আর সামনে দাঁড়ানো একজন রোগা তরুণ, লুঙ্গি পরা। "নানা, এটা কে?" নানা কলম থামালেন। "আমি।" মাহদী ছবিটার দিকে আবার তাকাল, বিশ্বাস হচ্ছিল না। "এটাই ছিল আড়ত?" "এটাই," নানা উঠে এসে ছবিটার পাশে দাঁড়ালেন। "চারটা বস্তা দিয়ে শুরু। ধার করা।"
"তখন এই এলাকার সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী কে ছিলেন?" নানা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। "হাশেম মিয়া। তিনটা গুদাম, দুইটা ট্রাক। এলাকার সবাই তাঁর কাছে ধার নিত।" "এখন উনি কোথায়?" "তিনি নেই। আর তাঁর ছেলেরা সব বিক্রি করে চলে গেছে," নানা চেয়ারে ফিরে বসলেন। "এখন ওই জায়গাটায় একটা চায়ের দোকান।" মাহদী কিছু বলতে পারল না।
মাহদী ছবিটার আরেকটু কাছে গেল। তরুণ নানার পাশে আবছা আরেকটা মুখ — শাড়ির আঁচল মাথায়, হাতে একটা খাতা। "নানা, পাশে কে?" নানা এবার কলমটা একেবারে নামিয়ে রাখলেন। "তোর নানি," গলাটা বদলে গেল। "আর সত্যি বলতে, ছবিটা আমার না — ওর।" "মানে?" "চারটা বস্তা ধার করার সাহসটা আমার ছিল না, দাদুভাই। আমি ভয় পেয়েছিলাম। শোধ দিতে না পারলে? জমি চলে যাবে?" নানা ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। "তোর নানি সেই রাতে বলেছিল — ধার করো। আমি কানের দুল বেচে দিচ্ছি। না হলে আমরা সারাজীবন অন্যের গুদামে কাজ করব।"
মাহদী হাঁ হয়ে গেল। "নানি দুল বিক্রি করেছিলেন?!" "করেছিল। আর হিসাবের খাতাটাও ও-ই রাখত — ওই যে হাতে দেখছিস," নানা হাসলেন, কিন্তু চোখটা ভেজা। "যতবার আমি থেমে গেছি, ততবার ও ধাক্কা দিয়েছে। ঘেরগুলোও ওর কথাতেই কেনা। সবাই বলেছিল লবণ পানির জমি কেউ কেনে না।" "তাহলে সবাই আপনাকে কেন বড় ব্যবসায়ী বলে? নানিকে কেন বলে না?" নানা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। "কারণ মানুষ যা দেখে, তা-ই বলে," তিনি শেষে বললেন। "কিন্তু আল্লাহ যা দেখেন, সেটা আলাদা। আর ওই খাতাটা তাঁর কাছেই আছে।"
"এইজন্যই ছবিটা ঝুলিয়ে রেখেছি, দাদুভাই," নানা কলম তুলে নিলেন। "যেদিন মনে হবে এই আড়ত আমার, সেদিন ওই ছবিটার দিকে তাকাব। চারটা বস্তা থেকে এখানে এনেছেন যিনি, তিনি আবার চারটা বস্তায় নামিয়ে দিতে পারেন।"
সেই রাতে হুদহুদ বলল, "আজকের আয়াতটা একটা দোয়া। আর এটা তুমি সারাজীবন পড়বে।" قُلِٱللَّهُمَّمَـٰلِكَٱلْمُلْكِ(কুলিল্লাহুম্মা মালিকাল মুলক — বলুন: হে আল্লাহ, রাজত্বের মালিক!)। "ٱلْمُلْك!" মাহদী সাথে সাথে বলল। "সূরা মূলক!" "হ্যাঁ। আর مَـٰلِك — মনে আছে সূরা ফাতিহা? مَـٰلِكِيَوْمِٱلدِّينِ!" "একই শব্দ!" "একই পরিবার — ملك। আর বাংলায় তুমি বলো মালিক, মালিকানা।"
তারপর হুদহুদ পরের অংশটা পড়ল, প্রতিটা লাইনে থামল: تُؤْتِىٱلْمُلْكَمَنتَشَآءُ — আপনি যাকে চান রাজত্ব দেন। وَتَنزِعُٱلْمُلْكَمِمَّنتَشَآءُ — আর যার থেকে চান রাজত্ব কেড়ে নেন। "تَنزِعُ মানে টেনে ছিঁড়ে নেওয়া," হুদহুদ বলল। "শুধু নেওয়া নয় — টেনে বের করে নেওয়া।" মাহদীর ছবিটার কথা মনে পড়ল। তিনটা গুদাম, দুইটা ট্রাক। এখন একটা চায়ের দোকান।
وَتُعِزُّمَنتَشَآءُوَتُذِلُّمَنتَشَآءُ — যাকে চান সম্মানিত করেন, যাকে চান হীন করেন। "تُعِزُّ," হুদহুদ বলল। "বাংলায়?" "ইজ্জত!" "আর تُذِلُّ?" "যিল্লতি!" "চমৎকার। আর ذُلّ-এর সাথে আরেকটা শব্দ চেনা লাগছে?" মাহদী কিছুক্ষণ ভেবে চেঁচিয়ে উঠল — "ذَلُول! সূরা মূলক! পৃথিবীকে বশ করে দিয়েছেন!" হুদহুদ ডানা ঝাপটে লাফাল। "অসাধারণ, সেনাপতি! একই পরিবার — নরম হওয়া, বশ মানা। কিন্তু খেয়াল করো তফাতটা: পৃথিবীর বেলায় ذَلُول হলো নিয়ামত — নরম মাটি, চাষ করা যায়। আর অহংকারী মানুষের বেলায় ذُلّ হলো শাস্তি। একই নরম হওয়া। কিন্তু একটা স্বেচ্ছায়, আরেকটা জোর করে।"
মাহদী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, "হুদহুদ, নানা আজ বলেছেন যিনি চারটা বস্তা থেকে এখানে এনেছেন, তিনি আবার নামিয়েও দিতে পারেন।" "আর সেটা শুনে তোমার ভয় লেগেছে?" মাহদী মাথা নাড়ল। "একটু।" "তাহলে আয়াতের শেষ লাইনটা শোনো।" بِيَدِكَٱلْخَيْرُۖإِنَّكَعَلَىٰكُلِّشَىْءٍقَدِيرٌ (বিয়াদিকাল খইর · ইন্নাকা আলা কুল্লি শাইইন কাদীর — কল্যাণ আপনারই হাতে; নিশ্চয়ই আপনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান)। "খেয়াল করেছ?" হুদহুদ বলল। "আল্লাহ বলেননি ভালো-খারাপ দুটোই আমার হাতে। বলেছেন — কল্যাণ আপনার হাতে।"
"শুধু ভালোটা?" "শুধু ভালোটার কথা বলা হলো, সেনাপতি। কারণ আয়াতটা তোমাকে ভয় দেখাতে আসেনি — এসেছে তোমাকে বলতে কার কাছে হাত পাততে হবে।" সে ডানা মেলল। "যিনি দেন, তিনিই নিতে পারেন। কিন্তু হাতটা যেহেতু একই, তুমি জানো কার কাছে চাইতে হবে।"
পরদিন সকালে তাসমিয়া নাশতার টেবিলে ঘোষণা করল, "আজ আমার জন্মদিন! ভাইয়া, তুমি আমাকে একটা দোয়া শেখাও।" মাহদী খাতা খুলতে গিয়ে থেমে গেল। সে খুঁজল, আবার খুঁজল, তারপর দাদার কাছে গেল। "দাদা, জন্মদিনের দোয়া কোনটা?" দাদা কাগজটা নামিয়ে রাখলেন। "সোজা উত্তর দিই? নেই।" "নেই?" "কুরআনে নেই, নবীজির (সা.) সুন্নাহেও জন্মদিনের আলাদা কোনো দোয়া নেই। কেউ যদি বলে এটা জন্মদিনের দোয়া — সে বানিয়ে বলছে," দাদা মাহদীর দিকে তাকালেন। "আর দ্বীনে নিজে থেকে জিনিস বানানোটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক কাজ, দাদুভাই। যা আছে ততটুকুই বলবে, একটুও বেশি না।"
মাহদীর মুখ শুকিয়ে গেল। "তাহলে তাসমিয়াকে কিছুই বলা যাবে না?" "তা তো বলিনি," দাদা হাসলেন। "কারো জন্য বরকতের দোয়া করা যায় — যেকোনো খুশির দিনে, যেকোনো দিন। নবীজি (সা.) খুশির উপলক্ষে বলতেন — بَارَكَاللَّهُلَكَوَبَارَكَعَلَيْكَ (বারাকাল্লাহু লাকা ওয়া বারাকা আলাইকা — আল্লাহ তোমার জন্য বরকত দিন, তোমার ওপর বরকত দিন)।" "এটা জন্মদিনের দোয়া?" "না। এটা মানুষের জন্য দোয়া," দাদা আঙুল তুললেন। "পার্থক্যটা ধরতে পারলে? এটা যেকোনো দিন বলা যায়। জন্মদিন উদযাপন করা ঠিক কি না, সেটা নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে — আমি সেই তর্কে যাব না। কিন্তু একটা কথা শিখে রাখো: যেটার প্রমাণ নেই, সেটাকে প্রমাণ আছে বলে চালিয়ে দিয়ো না।"
মাহদী ফিরে গিয়ে তাসমিয়াকে বলল, "তোর জন্মদিনের কোনো দোয়া নেই।" তাসমিয়ার মুখ কালো হয়ে গেল। "কিন্তু তোর জন্য একটা দোয়া আছে," মাহদী পাশে বসল। "আর ওটা আমি বছরের যেকোনো দিন বলতে পারি।" 🖼️
🗣️ উচ্চারণ: কুলিল্লাহুম্মা মালিকাল মুলকি তুতীল মুলকা মান তাশাউ ওয়াতানযিউল মুলকা মিম্মান তাশাউ ওয়াতুইয্যু মান তাশাউ ওয়াতুযিল্লু মান তাশাউ বিয়াদিকাল খাইরু ইন্নাকা আলা কুল্লি শািন কাদীর
💬 অর্থ: বলুন, ‘হে সার্বভৌম শক্তির মালিক আল্লাহ্! আপনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা প্রদান করেন এবং যার থেকে ইচ্ছা ক্ষমতা কেড়ে নেন; যাকে ইচ্ছা আপনি সম্মানিত করেন আর যাকে ইচ্ছা আপনি হীন করেন। কল্যান আপনারই হাতে। নিশ্চয়ই আপনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।
⚖️ জন্মদিনের জন্য কুরআন বা সুন্নাহে আলাদা কোনো দুআ নেই — এটা স্পষ্ট করে বলা দরকার। বর্ণনায় এই দুআটি বিয়ের শুভেচ্ছা হিসেবে এসেছে। বরকতের দোয়া করা যেকোনো খুশির উপলক্ষে জায়েজ, কিন্তু "জন্মদিনের দুআ" বলে কিছু চালিয়ে দেওয়া যাবে না। জন্মদিন উদযাপন নিয়ে আলিমদের মধ্যে মতভেদ আছে — সেটাও গোপন করা হয়নি।
আয়াতটায় চারটে কাজ, দুই জোড়ায়: দেন ⟷ কেড়ে নেন · সম্মানিত করেন ⟷ হীন করেন। তারপর শেষে একটাই লাইন — بِيَدِكَٱلْخَيْرُ। জোড়া দুইটা মনে রাখলে চার লাইন একসাথে আসবে। আর এটা একটা দোয়া — মুখস্থ করে রোজ পড়ো, বিশেষ করে যখন কিছু চাইতে ইচ্ছে হয়। 🤲
🎮 খেলা: তোমার পুরনো ছবি
বাড়ির কারো কাছে একটা পুরনো ছবি খুঁজে বের করো — আম্মু-আব্বুর ছোটবেলার, বা বাড়িটার আগের চেহারা। ভালো করে দেখো। তারপর খাতায় লেখো: তখন কী ছিল না, আর এখন কী আছে? শেষে লেখো আয়াতটা: بِيَدِكَٱلْخَيْرُ — কল্যাণ আপনারই হাতে। 🖼️
🧠 অনুশীলনের ঘর
একই শব্দগুলো, তিনভাবে। যেটা ভালো লাগে সেটা দিয়ে শুরু করো — ভুল হলে কিছুই হারায় না।