ঘুম ভাঙল ফজরের আজানে।
নামাজ শেষে মাহদী তাসমিয়ার ঘরে গেল। নক করল। "তাসমিয়া, কাল আমি একটা বাজে কথা বলেছি। তুই কিছু জানিস না — এটা ঠিক না।" তাসমিয়া চোখ কচলে বলল, "আমি তো সত্যিই জানি না।" "তুই তো জিজ্ঞেস করতে জানিস।" মাহদী পাশে বসল। "আর সেটাই সবচেয়ে বড় জিনিস। আমার সব শুরুই তো তোর একটা প্রশ্ন থেকে।" "কোন প্রশ্ন?" মাহদী হাসল। "মনে নেই তোর?"
সেই রাতে ম্যাপের দ্বিতীয় দ্বীপটা পুরো সোনালি হয়ে জ্বলে উঠল! ⚖️ হুদহুদ মাহদীর সামনে এসে দাঁড়াল, আর এবার গলাটা গম্ভীর। "চার সপ্তাহে তুমি অনেক কিছু দেখেছ। পৃথিবী কেঁপেছে, পাল্লা ঝুলেছে, কবর খুলেছে। ভয় পেয়েছ, তাই না?" "পেয়েছি।" "কিন্তু দ্বীপটা ভয় দিয়ে শেষ হলো না। খেয়াল করেছ?" হুদহুদ ডানার পালকে গুনতে লাগল। "আল্লাহ বললেন — তুমি আহসানি তাকভীম। তোমার রব তোমাকে ছাড়েননি। কষ্টের সাথেই স্বস্তি। এতিমকে ধমক দিয়ো না। আর সবার প্রথম আদেশ — পড়ো।" "তাহলে ভয়ের কথাগুলো কেন ছিল?" "কারণ ঘুমন্ত মানুষকে আগে জাগাতে হয়, তারপর রাস্তা দেখাতে হয়।" হুদহুদ বলল। "যে জেগেই নেই, তাকে রাস্তা দেখিয়ে কী লাভ?"
সে ম্যাপটা গুটিয়ে নিল। তারপর দ্বিতীয় সোনালি টুকরোটা মাহদীর হাতে দিল — ঢালে বসিয়ে দিল, খট করে শব্দ হলো। "ঢালের দুই টুকরো হলো। আরও চারটা বাকি।" "আর এই দ্বীপের জিনিসটা?" মাহদী জিজ্ঞেস করল। "গতবার চশমা দিয়েছিলে।" "আজ দেব একটা পাল্লা।" হুদহুদ তার হাতে তুলে দিল ছোট্ট এক জোড়া দাঁড়িপাল্লা — এত ছোট যে হাতের তালুতে হারিয়ে যায়, আর এত হালকা যে ওজন বোঝা যায় না।
মাহদী এদিক-ওদিক নাড়ল। "এটা তো কিছুই মাপছে না!" "তোমার জিনিস মাপবে না, মাহদী। ওজন মাপার আসল পাল্লা সেদিন বসবে, আর সেটা আল্লাহর কাছে। এটা শুধু একটা প্রশ্ন মনে করিয়ে দেবে।" "কী প্রশ্ন?" "যখনই কিছু করতে যাবে — مِثْقَالَ ذَرَّةٍ (মিসকালা যাররাহ — অণু পরিমাণ) মনে করবে, আর নিজেকে জিজ্ঞেস করবে: এটা কোন পাল্লায় যাবে? ব্যস। এইটুকুই।" সে ঝুঁটি নাড়ল। "চশমা তোমাকে তাকাতে শেখায়। পাল্লা শেখায় থামতে। দুটোই তোমার ভেতরে ছিল — আমি শুধু নাম দিলাম।"
তারপর হুদহুদ দূরে তাকাল। সমুদ্রের ওপারে কুয়াশার ভেতর একটা দ্বীপের আবছা রেখা। "সামনে নবীজির দ্বীপ 🌙। ওখানে তুমি সূরা আলাক শেষ করবে, শিখবে সূর্য আর চাঁদের শপথ..." সে থেমে গেল। ঝুঁটিটা কেঁপে উঠল। "হুদহুদ?" "...আর ওখানেই আমি তোমাকে বলব ছায়াটার আসল নাম।" জঙ্গলের দিক থেকে ফিসফিসানিটা আজ অনেক কাছে শোনাচ্ছে। "তিনটে শব্দ তুমি এই আট সপ্তাহে বারবার শুনেছ, মাহদী। يُكَذِّبُ সূরা মাউনে। يُكَذِّبُكَ সূরা তীনে। আর তোমার ব্যাকরণের পাতায় একটা নাম — كَذَّاب।" মাহদীর গা শিরশির করে উঠল।
জাহাজে ওঠার সময় হুদহুদ বলল, "সফরে বেরোনোর আগে একটা কথা বলতে হয়। শোনো। سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَٰذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ (সুবহানাল্লাযী সাখখারা লানা হাযা ওয়া মা কুন্না লাহু মুকরিনীন)। পবিত্র সেই সত্তা, যিনি একে আমাদের বশ করে দিয়েছেন — অথচ আমরা একে বশ করার ক্ষমতা রাখতাম না।" "বশ করা?" মাহদী জাহাজের কাঠের রেলিং ছুঁয়ে দেখল। "ভাবো তো। সমুদ্র তোমার চেয়ে কত বড়? বাতাস তোমার চেয়ে কত শক্তিশালী?" হুদহুদ ঝুঁটি নাড়ল। "অথচ কাঠের একটা টুকরো ভেসে থাকে, আর বাতাস তোমাকে যেদিকে যেতে চাও সেদিকেই নিয়ে যায়। কে রাজি করাল?" মাহদী উত্তর দিল না। "এই দুআটা নানার ট্রাকেও চলে, আব্বুর প্লেনেও চলে, তোমার সাইকেলেও চলে।" হুদহুদ ডানা মেলল। "مُقْرِنِين মানে — যে সামলাতে পারে। আমরা পারি না, সেনাপতি। আমরা শুধু চড়ে বসি।"
"তুমি প্রস্তুত তো, সেনাপতি?" 👁️