রাতে খাবার টেবিলে মাহদীর মুখ ভার। "চাচাতো ভাই নতুন সাইকেল পেয়েছে," সে ভাত নাড়তে নাড়তে বলল, "গিয়ার লাগানো। আমার তো কিছুই নেই।" নানা চুপচাপ খাচ্ছিলেন। কিছু বললেন না।
রাতে বৃষ্টি নামল — শ্রাবণের ঝুম مَطَر(মাতার — বৃষ্টি)। মাহদী পানি খেতে উঠে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। গেটের পাশে কালু বসে আছে, নানার বাড়ির পাহারাদার كَلْب(কালব — কুকুর)। ভিজে চুপচুপে, কান দুটো ঝুলে পড়েছে, কিন্তু বসে আছে সোজা হয়ে — গেটের দিকে মুখ করে।
সকালে মাহদী নানাকে জিজ্ঞেস করল, "নানা, কালু বৃষ্টিতে ভেতরে আসে না কেন? আমি তো ডেকেছিলাম।" "আসবে না," নানা চা ঢালতে ঢালতে বললেন। "সাত বছর ধরে ওই গেট ওর। কেউ ওকে বলেনি বসে থাকতে, কেউ ওকে বেতনও দেয় না।" তিনি কাপটা নামিয়ে মাহদীর দিকে তাকালেন। "কাল রাতে ওই কুকুরটা ভিজতে ভিজতে পাহারা দিল। আর আমার নাতি ভাত নাড়তে নাড়তে বলল, আমার তো কিছুই নেই।" মাহদী মাথা তুলতে পারল না।
সেই রাতে দ্বীপে হঠাৎ খট-খট-খট! ধুলো উড়িয়ে ছুটে এল একদল ঘোড়া, খুরের আঘাতে পাথর থেকে আগুনের ফুলকি ছিটকাচ্ছে। "সুবহানাল্লাহ, কী সুন্দর!" মাহদী মুগ্ধ হয়ে বলল। "সূরা আদিয়াতে আল্লাহ এই ঘোড়াদেরই শপথ করেছেন," হুদহুদ বলল। "وَٱلْعَـٰدِيَـٰتِضَبْحًا(ওয়াল আদিয়াতি দাবহা — শপথ হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ানো ঘোড়াদের)। ضَبْح(দাবহ) মানে ছোটার সময় ঘোড়ার নিঃশ্বাসের শব্দ। ভাবো তো — আল্লাহ ওদের নিঃশ্বাসটা পর্যন্ত আয়াতে রেখে দিলেন!" পাঁচটা দৃশ্য একটার পর একটা ভেসে উঠল — ছুটছে, ফুলকি উড়ছে, ভোরবেলা ঝাঁপিয়ে পড়ছে, ধুলো উড়ছে, শত্রুদলের মাঝখানে ঢুকে পড়ছে। "এত সুন্দর শপথের পর আল্লাহ কী বললেন জানো?" হুদহুদ থামল। "إِنَّٱلْإِنسَـٰنَلِرَبِّهِۦلَكَنُودٌ(ইন্নাল ইনসানা লিরব্বিহি লাকানূদ — নিশ্চয়ই মানুষ তার রবের প্রতি বড়ই অকৃতজ্ঞ)।"
মাহদী ভুরু কুঁচকাল। "ঘোড়ার প্রশংসা করে হঠাৎ মানুষের নিন্দা? দুটোর সম্পর্ক কী?" "চমৎকার প্রশ্ন!" হুদহুদ খুশি হলো। "তুলনাটাই আসল কথা। ঘোড়াটা দেখো — মনিবের জন্য জীবন দিয়ে ছুটছে, বুক ফেটে যাচ্ছে, তবু থামছে না। ওকে কেউ কিছু দেয়নি। এক মুঠো ঘাস, ব্যস। তবু সে বিশ্বস্ত। আর মানুষ? আল্লাহ তাকে চোখ দিলেন, হাত দিলেন, মা দিলেন, ভাত দিলেন — আর সে বলে আমার তো কিছুই নেই।" মাহদীর গলা শুকিয়ে গেল। কাল রাতের ভেজা কালুর ছবিটা চোখে ভাসল।
"كَنُود(কানূদ) শব্দটার মানে জানো?" হুদহুদ বলল। "এমন জমি, যেখানে বৃষ্টি পড়ে, রোদ পড়ে, সার পড়ে — অথচ কিছুই জন্মায় না। সব নেয়, কিছুই ফেরত দেয় না।" সে মাহদীর কাঁধে বসল। "তোমার নানা কৃষিব্যবসা করেন। এমন জমির নাম শুনলে উনি কী বলতেন?" "বলতেন... ওই জমি আর রাখা যাবে না।" "আল্লাহ কিন্তু রেখে দিয়েছেন," হুদহুদ নরম গলায় বলল। "চৌদ্দশো বছর ধরে অভিযোগটা লেখা আছে, তবু বৃষ্টি বন্ধ হয়নি। এইটাই রহমত।"
সকালে বেরোনোর সময় মাহদী দেখল কালু গেটের পাশে শুয়ে আছে, সারারাত পাহারা দিয়ে ক্লান্ত। "কালু ভালো পাহারাদার, না দাদি?" "খুব ভালো।" দাদি জুতোটা এগিয়ে দিলেন। "কিন্তু কালু তো গেট পর্যন্ত। তুই তো মাদ্রাসা পর্যন্ত যাবি। রাস্তায় তোর পাহারাদার কে?" মাহদী থেমে গেল।
"ঘর থেকে বেরোনোর সময় নবীজি (সা.) যা বলতেন, সেটা শিখে নে —" দাদি আস্তে আস্তে বললেন, "بِسْمِاللَّهِتَوَكَّلْتُعَلَىاللَّهِ(বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ — আল্লাহর নামে, আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করলাম)।" "تَوَكَّلْتُ?" মাহদী শব্দটা চিনতে চেষ্টা করল। "وَكِيل... উকিল! এটা কি সেই পরিবারের?" "একই পরিবার।" দাদি হাসলেন। "উকিলের হাতে কাজটা ছেড়ে দেওয়া — ওটাই তাওয়াক্কুল।"
সেই রাতে হুদহুদ কথাটা শেষ করে দিল। "আর মনে রেখো, তাওয়াক্কুল মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়, সেনাপতি। উট বাঁধা হাদিসটা মনে আছে? আগে উট বাঁধো, তারপর ভরসা করো। কালুকে খেতে দাও, গেট বন্ধ করো — তারপর বলো তাওয়াক্কালতু।" 🐎
🎯 আজ আমি যা শিখব
তাজবীদ: যে আলিফ পড়া হয় না
সূরা আল-আদিয়াত — আয়াত ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬
১৬টি শব্দের অর্থ
আজকের গল্প আর কোথায় কাজে লাগাব
🔤 তাজবীদের জাদু
যে আলিফ পড়া হয় না: হামযাতুল ওয়াসল
শব্দের শুরুতে মাথার উপর ছোট্ট এই চিহ্নটা (ٱ) দেখেছ? এর নাম হামযাতুল ওয়াসল — মানে জোড়া লাগানোর হামযা।
নিয়মটা সোজা: শুরু করলে পড়ো, মাঝখানে এলে পড়ো না — আগের শব্দের সাথে জুড়ে দাও।
🪄 সূত্রٱ = শুরুতে পড়ি · মাঝে এলে গিলে ফেলি
নিজে করে দেখো: একা পড়লে ٱلْحَمْدُ = "আলহামদু"। কিন্তু আগে বিসমিল্লাহ থাকলে? "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীমিল হামদু" — আল উধাও! এই এক নিয়ম না জানলে তেলাওয়াতে হোঁচট খেতেই থাকবে।
🧩 ব্যাকরণের গল্প: ـَات — অনেকজনের লেজ
সূরা আদিয়াতের প্রথম তিন আয়াতে শব্দগুলোর শেষটা খেয়াল করো: ٱلْعَـٰدِيَـٰت · ٱلْمُورِيَـٰت · ٱلْمُغِيرَٰت
"তিনবারই ـَات," হুদহুদ বলল। "মনে আছে ক্লাস ৩-এ শিখেছিলে গোল ة মানে একজন মেয়ে? এবার দেখো — সেই ة যখন ـَات হয়ে যায়, তখন মানে দাঁড়ায় অনেকজন!"
"ঘোড়াগুলো তো একটা নয় — একটা গোটা বাহিনী। তাই লেজটাও বহুবচনের।"