ঘুম ভাঙল ফজরের আজানে। চার সপ্তাহ হয়ে গেল। মাহদী উঠে বসে খেয়াল করল — আজ আর সে আজানটা শুধু শুনছে না। বুঝছে। আল্লাহু আকবার — আল্লাহ সবচেয়ে বড়। হাইয়া আলাল ফালাহ — কল্যাণের দিকে এসো।
নাশতার টেবিলে তাসমিয়া হঠাৎ বলল, "ভাইয়া, তুমি বদলে যাচ্ছ।" "কীরকম?" "আগে তুমি পড়তে জোরে। এখন পড়ো আস্তে।" সে কাঁধ ঝাঁকাল। "কেন?" মাহদী একটু ভেবে বলল, "কারণ আগে আমি শুধু পড়তাম। এখন... শুনি।" দাদা কাগজের আড়াল থেকে চোখ তুলে তাকালেন। কিছু বললেন না, শুধু চায়ের কাপটা তুলে একটা ছোট্ট সালাম ঠুকলেন।
নাশতা শেষে মাহদী নানার কাছে গেল। গলাটা শুকিয়ে ছিল। "নানা, গত সপ্তাহে আমি আল ভেঙে গিয়েছিলাম। কয়েকটা চারা নষ্ট হয়েছে। কেউ দেখেনি, আমি বলিনি।" নানা আবু বক্কার সরদার অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর হাতের বীজের ঠোঙাটা নামিয়ে রেখে বললেন, "চারা আবার লাগানো যায়, দাদুভাই। কিন্তু যে ছেলে নিজের দোষ নিজে বলতে আসে — সেটা আমি বাজারে কিনতে পাই না।"
তিনি একমুঠো বীজ মাহদীর হাতে দিলেন। "চল, দুজনে মিলে লাগাই।" তাসমিয়া দরজার পাশ থেকে সব শুনছিল। সে কিছু বলল না — শুধু দৌড়ে গিয়ে নিজের কায়দাটা নিয়ে এল, আর মাহদীর পাশে বসে পড়ল। "আমাকেও শেখাও। কালকেরটা।"
সেই রাতে দ্বীপে ম্যাপের প্রথম দ্বীপটা পুরো সোনালি হয়ে জ্বলে উঠল! 🌅 হুদহুদ ডানা মেলে মাহদীর সামনে দাঁড়াল। "চার সপ্তাহ আগে তুমি ছিলে শুধু একজন যাত্রী।" "আর এখন?" "এখন তুমি জানো কীভাবে আশ্রয় চাইতে হয়। জানো কীভাবে সীমারেখা টানতে হয়। জানো কেন ছোট্ট পাখিও হাতিকে হারায়। আর জানো — যে নামাজ মানুষকে দয়ালু বানায় না, সেটা শুধু ওঠা-বসা।"
তারপর হুদহুদ কী একটা বের করল — সোনালি এক টুকরো ধাতু, বাঁকা, হাতের তালুর মতো। "ঢালের প্রথম টুকরো। মনে আছে, কোথায় পেয়েছিলে?" "যেদিন বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল," মাহদী বলল। "যেদিন আমি ভয় পেয়েছিলাম।" "হ্যাঁ। আর আজ সেটা বসে গেল জায়গামতো।" হুদহুদ টুকরোটা মাহদীর হাতে দিল। ঠান্ডা, কিন্তু ভারী নয়।
"আর ওই তিনটে গিঁট?" মাহদী জিজ্ঞেস করল। "সে কি হেরে গেল?" "না।" হুদহুদের গলা শান্ত। "ওয়াসওয়াস হারে না, মাহদী। সে শুধু পিছিয়ে যায়। সূরা নাসে তার দ্বিতীয় নামটা মনে আছে? ٱلْخَنَّاس (আল-খান্নাস — যে পিছু হটে, লুকিয়ে পড়ে)। তুমি আল্লাহকে মনে করলে সে সরে যায়। তুমি ভুলে গেলে সে ফিরে আসে। তাই দুর্গটা একবার বানিয়ে রেখে দেওয়ার জিনিস নয় — রোজ সকালে দাঁড় করাতে হয়।"
"আর একটা জিনিস বাকি আছে।" হুদহুদ ডানার নিচ থেকে বের করে আনল পাতলা এক টুকরো কাচ — গোল, সরু ফ্রেমে বসানো। একদম দাদার চশমার মতো। "এর নাম নূরের চশমা। চোখে দাও।" মাহদী চোখে দিল — আর হতাশ হয়ে গেল। "কিছুই তো বদলায়নি! সব আগের মতোই আছে।"
"একদম ঠিক!" হুদহুদ খুশিতে ঝুঁটি ফুলাল। "এই চশমা নতুন কিছু দেখায় না। এটা জাদুর জিনিস নয়, তাবিজও নয়, এর নিজের কোনো ক্ষমতা নেই। এটা শুধু একটা কাজ করে — তোমাকে থামায়।" "থামায়?" "যা তুমি রোজ দেখো অথচ কোনোদিন তাকাওনি — তার সামনে এসে তুমি এক সেকেন্ড থমকে দাঁড়াবে। কদমগাছ থেকে টুপটাপ পানি পড়া। পিঁপড়ার সারি। নানার হাতের একমুঠো বীজ। তারপর নিজেকে জিজ্ঞেস করবে — এটা কার কাজ?"
সে গলা নামাল। "সত্যি বলতে, চশমাটা তোমার নাকের উপর নেই। ওটা তোমার بَصَر (বাসার — দৃষ্টি)-এর পেছনে — অনেক আগে থেকেই ছিল। আমি শুধু একটা নাম দিলাম, যাতে তুমি ভুলে না যাও।" মাহদীর হঠাৎ প্রথম রাতের কথা মনে পড়ল — দাদা চশমাটা মুছতে মুছতে তার নামের মানে বলেছিলেন। দাদা কি সারাজীবন এই চশমাটাই পরে আছেন?
তারপর সে দূরে সমুদ্রের দিকে তাকাল। "সামনে তুলাদণ্ডের দ্বীপ ⚖️। ওখানে দেখবে দৌড়ন্ত ঘোড়া, ঝুলন্ত পাল্লা, আর এমন এক রাত যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।" "আর তার পরের দ্বীপে?" মাহদী জিজ্ঞেস করল। হুদহুদ চুপ করে রইল। ঝুঁটিটা একবার কেঁপে উঠল। "তার পরের দ্বীপে," সে আস্তে বলল, "আমি তোমাকে ছায়াটার আসল নাম বলব।"
"একটা শেষ কথা," হুদহুদ বলল। "চার সপ্তাহ ধরে তুমি কাজ করেছ। এখন একটা কথা শিখে রাখো, যেটা প্রত্যেক কাজ শেষ হলে বলবে। الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي بِنِعْمَتِهِ تَتِمُّ الصَّالِحَاتُ (আলহামদু লিল্লাহিল্লাযী বিনি'মাতিহী তাতিম্মুস সালিহাত)। সব প্রশংসা আল্লাহর — যাঁর অনুগ্রহে ভালো কাজগুলো পূর্ণ হয়।"
"পূর্ণ হয়?" মাহদী খেয়াল করল। "আমি করি না?" "শুরু তুমি করো।" হুদহুদ বলল। "কিন্তু শেষ হওয়াটা তোমার হাতে নেই, সেনাপতি। কত মানুষ শুরু করে শেষ করতে পারে না — অসুখ হয়, মন উঠে যায়, সময় ফুরিয়ে যায়। তুমি চার সপ্তাহ টিকে থেকেছ। ওটা তোমার কৃতিত্ব নয়, ওটা অনুগ্রহ।"
মাহদী ঢালের টুকরোটার দিকে তাকাল, হাতের তালুতে ঠান্ডা। আজ শুধু উদযাপন। কাল থেকে নতুন سَفَر (সাফার — যাত্রা)! 🎉