ঘুম ভাঙল ফজরের আজানে। একশো ক্লাস। বিশ সপ্তাহ। নামাজ শেষে মাহদী শব্দের ঝুড়ি খুলল আর গুনল। দুইশো ঊনআশি। সে খাতাটা নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসল, তারপর প্রথম পাতাটা খুলল — বিশ সপ্তাহ আগে যেদিন শুরু করেছিল। প্রথম শব্দ তিনটে ছিল: رَبّ · ٱلْحَمْد · نَار। হাতের লেখা কী বাজে ছিল তখন! সে শেষ পাতায় গেল, সেখানে গতকালের শব্দ: تَضَرُّع · خُفْيَة · مُسَخَّرَات।
তাসমিয়া এসে পাশে বসল, হাতে তার নিজের খাতা। "আমার একশো এগারোটা হয়েছে," সে বলল। "সত্যি?!" "গুনে দেখো।" মাহদী গুনল। সত্যিই। সে বোনের দিকে তাকিয়ে রইল। বিশ সপ্তাহ আগে এই মেয়েটাই তাকে একটা প্রশ্ন করেছিল যেটার উত্তর সে জানত না। "তাসমিয়া, তোর মনে আছে তুই আমাকে কী জিজ্ঞেস করেছিলি? সেই প্রথম দিন?" তাসমিয়া মাথা নাড়ল। "মনে নেই তো।" মাহদী হাসল। "আমার আছে।" 📔
সেই রাতে ম্যাপের পঞ্চম দ্বীপটা পুরো সোনালি হয়ে জ্বলে উঠল! 👑 হুদহুদ ম্যাপটা গুটিয়ে নিল না, বরং সেটা মেলে ধরে রাখল। "তাকিয়ে দেখো, সেনাপতি।" মাহদী দেখল — পাঁচটা দ্বীপ জ্বলছে। আলোর দ্বীপ · তুলাদণ্ডের দ্বীপ · নবীজির দ্বীপ · ঢালের দ্বীপ · রাজত্বের দ্বীপ। আর একদম শেষ কোণে, অন্ধকারে — সেই গুহাটা। "এই দ্বীপে কী পেলে, বলো তো?"
মাহদী গুনতে লাগল। "এক — যে বানিয়েছে, সে ভেতরটা জানে। দুই — মরা মাটি থেকে প্রাণ ওঠে। আর আজ আমার টবে ফুল ফুটেছে। তিন — রিজিক তাঁর হাতে, তাই মাথা তুলে হাঁটতে হয়। চার — কান, চোখ, অন্তর — আর কান সবসময় আগে। পাঁচ — নবীজিও (সা.) জানতেন না কিয়ামত কবে। ছয় — আমরা রায় দিই না। আমরা বলি মরহুম। সাত — আয়াতুল কুরসি। আর ওটা শিখিয়েছিল শয়তান নিজে। আট — দ্বীনে জোর নেই। দরজা খোলা রাখতে হয়। নয় — অন্ধকার অনেক, আলো একটা। দশ — জ্ঞানীরা ফেরেশতাদের পাশে সাক্ষী। এগারো — যিনি দেন, তিনি নিতেও পারেন। কিন্তু কল্যাণ তাঁর হাতে। বারো — দোয়া মানে চাওয়া নয়। ডাকা।"
হুদহুদ অনেকক্ষণ কিছু বলল না। তারপর সে ম্যাপটা নামিয়ে রাখল, মাহদীর সামনে এসে দাঁড়াল। "মাহদী বিন মামুন।" "বলো।" "বিশ সপ্তাহ আগে এই ঘাটে আমি তোমাকে দুইটা প্রশ্ন করেছিলাম। মনে আছে?" মাহদী মাথা নাড়ল। "رَبِّ মানে কী? আর ٱلْعَـٰلَمِينَ মানে কী?" "তুমি চুপ করে ছিলে।" "ছিলাম।" "আজ উত্তর দাও।"
মাহদী সোজা হয়ে দাঁড়াল। "رَبّ মানে প্রতিপালক — যিনি সৃষ্টি করে ছেড়ে দেন না, বড় করে তোলেন। আর ٱلْعَـٰلَمِينَ মানে সব জগৎ — মানুষের জগৎ, জিনের জগৎ, ফেরেশতার জগৎ, পোকামাকড়ের জগৎ, তারার জগৎ। সব।" হুদহুদের ঝুঁটিটা কেঁপে উঠল। সে কিছু বলল না অনেকক্ষণ। তারপর আস্তে বলল, "আমি বহু বছর ধরে চিঠি বয়ে বেড়াই, মাহদী। কিন্তু আজকের চিঠিটা সবচেয়ে ভালো।"
তারপর সে ঘুরে দাঁড়াল, দূরের সেই পাথুরে দ্বীপটার দিকে তাকাল। গুহামুখটা এখন অনেক কাছে, ভেতরটা কালো। "চার সপ্তাহ বাকি, সেনাপতি।" "শেষ দ্বীপ?" "শেষ দ্বীপ। গুহার দ্বীপ।" হুদহুদ ডানা ভাঁজ করল, তার গলাটা এমন হলো যেমন মাহদী আগে কখনো শোনেনি। "ওখানে তুমি তিনটে গল্প শুনবে — একদল ছেলে যারা তিনশো নয় বছর ঘুমিয়েছিল, একজন নবী যিনি শিখতে গিয়েছিলেন, আর একজন বাদশাহ যিনি লোহার দেয়াল বানিয়েছিলেন।" "আর তারপর?" হুদহুদ চুপ করে রইল। "তারপর," সে শেষে বলল, "ছায়াটা তোমার সামনে এসে দাঁড়াবে।"
মাহদী ঢালটার দিকে তাকাল। পাঁচ টুকরো বসানো। একটা জায়গা খালি। "তার আগে এই দ্বীপের জিনিসটা নাও," হুদহুদ তার হাতে তুলে দিল ছোট্ট এক মাটির গোলা — রুক্ষ, গোল, হাতের তালুতে ঠিক এঁটে যায়। "মাটি?" মাহদী একটু হতাশ। "এই দ্বীপটা শুরু হয়েছিল কী দিয়ে মনে আছে? تَبَـٰرَكَ ٱلَّذِى بِيَدِهِ ٱلْمُلْكُ (তাবারাকাল্লাযী বিয়াদিহিল মুলক — বরকতময় তিনি, যাঁর হাতে সমস্ত রাজত্ব)। বিশ সপ্তাহ ধরে তুমি রাজত্ব নিয়ে পড়েছ। এবার মুঠো করো।"
মাহদী মুঠো করল। গোলাটা হারিয়ে গেল হাতের ভেতর। "এখন তোমার হাতে একটা গোটা পৃথিবী ধরা আছে — এইটুকু," হুদহুদ বলল। "আর আসল পৃথিবীটা কার হাতে?" মাহদী আস্তে মুঠোটা খুলে ফেলল। "এইজন্যই জিনিসটা মাটির, সোনার নয়," হুদহুদ বলল। "সোনা হলে তুমি ওটা আঁকড়ে ধরে রাখতে। মাটি একদিন গুঁড়ো হয়ে যাবে — আর সেদিন তোমার মনে পড়বে, রাজত্বটা কোনোদিনই তোমার ছিল না।" "আমি প্রস্তুত।" হুদহুদ প্রথমবার হাসল না। শুধু মাথা নাড়ল। "জানি।" 🕳️